মুহুর্ত

সকাল থেকেই আজ আকাশের মন খারাপ। গম্ভীর কালো হয়ে আছে। তবে বাতাসে সেই গুমোট ভাব টা নেই। পশ্চিম থেকে শীতল বাতাস বয়ে যাচ্ছে। অভ্যাস মত ভোরে ঘুম ভেঙে গেল। এই সময় টায় কিছু করার থাকে না। পেপার ও আসেনি। আর আসলেও কি। আজকাল পেপার পড়তেও ইচ্ছা করে না। একবার ভাবলাম রাজিবকে ফোন দেই। অনেকদিন শীতলক্ষ্যার পাড় থেকে সূর্যোদয় দেখা হয় না। শাবদি পর্যন্ত ঘুরে আসা যাবে।কি ভেবে আর ফোন করলাম না। কি দরকার একাকিত্ব টা নষ্ট করে। বেড়িয়ে পড়লাম ঘর থেকে….

শহর থেকে দূরে, বিসিক শিল্প নগরীর পাশে একটা জায়গার নাম বাড়ৈ ভোগ। এখানকার আখড়ায় প্রতিমাকে বার পদের ভোগ দেয়া হয় সেই প্রাচীন কাল থেকে। সেই থেকে জায়গার নাম বাড়ৈ ভোগ। মেইন রোড থেকে নেমে একটু সামনে গেলেই দশ ফিট পাঁচিল দিয়ে ঘেরা বিশাল এক কম্পাউন্ড- আমার কর্মস্থল।
গেট খুলে ভিতরে ঢুকতেই সবুজ হলুদ আর লালের এক ধাক্কা এসে লাগল চোখে। গেট বরাবর সবুজ ঘাসের কার্পেট। ঠিক ডানেই অগোছালো বাগান। ঝাঁকে ঝাঁকে হলুদ কসমস ফুটে আছে। বাগানের পার ধরে রক্ত জবাদের মিছিল। সাজানো বাগান এর চেয়ে অগোছালো বাগান বেশী সুন্দর লাগে আমার কাছে। প্রকৃতির এই ব্যাপার গুলোতে মানুষের হাত পরলেই কেমন যেন এক মেকি ভাব চলে আসে। আমার গন্ধ টের পেয়ে গেছে জিনি। ঘেউ ঘেউ করতে করতে তীর বেগে এসে দিল এক লাফ আমার উপর। মনের আঁশ মিটানো আদর না করা পর্যন্ত আমাকে ছাড়বে না….
চোখের পলকে ফর্সা হয়ে গেছে চারিদিক। প্ল্যান্টের পিছনের ছোট্ট জংলাটা জেগে উঠেছে আগেই।এখানে অনেক পাখি আছে সেটা জানলেও আজকের মত আগে খেয়াল করে দেখিনি। কিচিরমিচির কুকু কাকা চিঁচিঁ আওয়াজে অশান্ত হয়ে উঠল জায়গা টা। কিন্তু খারাপ লাগছে না একটুও। গাছ-গাছালির ফাঁক দিয়ে পাখি গুলোকে দেখার চেষ্টা করতে লাগলাম। মন্ত্রমুদ্ধের মত তাকিয়ে আছি প্রকৃতির দিকে। এইদিক টায় সারি সারি তুলসি গাছ। দুটি পাতা ছিঁড়ে এর ঝাঁঝালো গন্ধ টুকু বুকে টেনে নিলাম।
- স্যার, আজকে এত সকালে? চাঁন মিয়ার কথা কানে যেতেই মোহ কেটে গেল।
-হুমম।
- স্যার আপনি তো আম গাছ গুলো দেখেন নাই। পিছনে গিয়া দেইখ্খা আসেন গিয়া। কেমনে আগলায় রাকসি।চামচিকা আর চড়ই এর জ্বালায় আর টিকা গেল না স্যার। ধনিয়া ক্ষেত টা পুরা সাফ করে দিসে।

উফফ্ ব্যাটা এত কথা বলে কেন? সামনে থেকে না সরালে পটর পটর করতেই থাকবে বুইরা ভাম।
- চাঁন মিয়া, একটা কড়া করে কফি আর একটা বেনসন নিয়া আস।

…জংলার আর একটু পিছন দিকে এগিয়ে যেতেই আম গাছ গুলো দেখা দিল। আমের ভারে গাছ গুলো নুয়ে পড়েছে মাটিতে। চোরের ভয়ে পাঁচিলের উপর বড়ই এর ডাল দেয়া। আম গাছের পাশেই কয়েকটি ভুট্টার গাছ। তার পাশে কচি পাটশাক আর ধনে পাতার টুকরো টুকরো ক্ষেত। বাঁশঝাড় টার ছায়ার নীচে কচি দূব্বার চাদরে গা এলিয়ে দিলাম। চোখের ঠিক সামনেই বিশাল কড়ই গাছ। গাছটির ডালে ডালে পাখির বাসা।শুয়ে শুয়ে পর্যবেক্ষন শুরু করলাম। কড়ই গাছে চারটি শালিক পরিবার আর একটি কাক পরিবার বাসা বেঁধেছে। সারাদিন শালিকের সাথে কাকেদের ঝগড়া। দুটা বাসায় মনে হয় ছানা আছে। ইশশ….আমি ফটোগ্রাফার হলে এগুলো তুলতে পারতাম। আম গাছ আর ডাব গাছে হাজার হাজার চড়ুই আর কাক পরিবারের সহবস্থান। শয়ে শয়ে চড়ুইয়েরা যখন ধনে পাতার ক্ষেতে হামলা চালায় তখন খুব চমত্‍কার লাগে। চাঁন মিয়ার দৌড়ানি খেয়ে আবার ঝাঁক বেধে উড়ে যায় নিরাপদ দূরত্বে। বেচারি বুড়োটা ঝিমানো শুরু করলেই আবার বি-৫০ জঙ্গি বিমানের মত হামলে পড়ে। ক্যাফেইন আর নিকোটিনের কম্বো রক্তে মিশতেই চনমনা হয়ে উঠলাম। দূরে জিনি একটা ইদুঁর মেরে এখন ওটা নিয়ে খেলছে। যেখানে বসে আছি ঠিক তার পাশেই পিঁপড়ার বড় একটা ঢিবি। শ্রমিক পিঁপড়া রা নানা জায়গা থেকে খাবার নিয়ে টুপ করে গর্তে ঢুকে যাচ্ছে। কতদিন পর আজকে বুলবুলি আর টুনটুনি দেখলাম।
আমার চারপাশে লাইভ ন্যাট জিও। কত কিছু উপভোগ করার আছে জীবনে। ঘুন পোকা কুড়ে কুড়ে খেয়ে ফেলার আগেই জীবনের মজা টা নিয়ে নেই।
এখন আমি আম পারব। কাঁচা আমের সরবত খাব। এরপর ডাব গাছে উঠে ডাব পারব। সেই সাথে ক্লাইম্বিং টাও প্র্যাকটিস হয়ে যাবে। দেখতে পারলে সবকিছু সুন্দর লাগে। মামুলি জিনিস ও খুব অসাধারন হয়ে ধরা দেয়। আফসোস করে আমি মরতে চাই না। পুরোটা উপভোগ করে তবে শ্রান্ত হব।
আই লাভ মাই লাইফ। এর উপর কারো অধিকার নাই। আমার ভিতু মনের ও নাই।

[গত কয়েকদিন থেকে মন টা অনেক অস্থির ছিল। হয়ত কিছুটা ভয় ও পেয়েছিলাম।অজানা আশংকায় নার্ভ গুলো সবসময় এলার্ট থাকত। ধুর কি লাভ চিন্তা করে। যা হবার তা হবেই। চিন্তা করে কিছু উল্টাতে পারব না। আবদুল্লাহ ভাই কে কোট করি- "চিন্তা করলে ব্রেন সেল মরে যায়, তাই আমি চিন্তা করি না।"
ভেবেছিলাম লেখাটা উত্‍সর্গ করব নিবিড় ও আসিফ কে। পরে উপলব্ধি হল এই আজাইড়া লেখা তাদের উত্‍সর্গ করার মানেই হয় না। ওদের উত্‍সর্গ করতে হবে একটা টাফ এক্সপিডিশন প্ল্যান। আসিফ ও নিবিড় তোমাদের চাঙ্গা হওয়ার অপেক্ষা আছি আমরা। তোমরা চাঙ্গা হলেই আমরা বেড়িয়ে পরব আবার। নতুন গন্তব্যে...অজানার উদ্দেশ্যে।]

 


নিঃসঙ্গ চিল

তপ্ত দুপুরের আকাশে নিঃসঙ্গ চিল এখনও কি উড়ে বেড়ায়? অনেকদিন পর ঘর থেকে বেড়িয়ে এই প্রশ্ন টাই মাথায় উঁকি দিল। আকাশের কোথাকার কোন চিলের উড়ে বেড়ানো দেখার মত সময় কই এখন? অনেক বড় হয়ে গেছি না? ছেলেখেলার বয়স সেই কবেই পার করে এসেছি। একটা সময় ছিল যখন নানাবাড়ি গেলেই এক দৌঁড়ে ছাদে চলে যেতাম। অদূরেই একটা তাল গাছের উপর চিলের বাসা ছিল। প্রতিদিন দুপুরে চিল টা শুধু শুধু উড়ে বেড়াত। কোথাও যেত না। শুধু গোল গোল চক্কর কাটতো। ঘন্টার পর ঘন্টা আমি তন্ময় হয়ে চিলের ভেসে বেড়ানো দেখতাম। অবাক হয়ে প্রশ্ন করতাম, চিল পাখা ঝাপ্টায় না কেন? অন্যান্য পাখি তো এভাবে ভেসে বেড়াতে পারে না? বড় মামার দূরবীন দিয়ে খুব কাছ থেকে তাকে দেখতাম। লালচে বাদামী তার গায়ের রঙ। বিরাট বিরাট পাখা। সূঁচালো বাঁকা ঠোঁট। হঠাৎ হঠাৎ ভাসতে ভাসতে একদম নিচে চলে আসত, তখন দেখতাম তার জ্বলজ্বলে তিক্ষ্ণ চোখ। মাঝে মাঝে দেখতাম পাশের ডাব গাছে ছোঁ মেরেই চিল টা উড়ে যেত। চিলের ধাঁরালো পাঞ্জায় ধরা থাকত কাকের ডিম, কখনো বা কাকের ছোট্ট ছানা। তারপর শুরু হয়ে যেত কাকেদের নরক গুলজার। মুহুর্তের মধ্যে কোথা থেকে যে এত কাক চলে আসত আজো বুঝে উঠতে পারলাম না। কা কা শব্দের প্রচন্ডতা আশে-পাশের কংক্রীটে প্রতিধ্বনিত হয়ে আরো জোড়ালো হয়ে ফিরে আসত। এরপর শুরু হয়ে যেত নিঃসঙ্গ চিলের সাথে একদল কাকের মর্মান্তিক যুদ্ধ। বিশাল সাইজের দাঁড় কাক গুলো নেতার মত সামনে চলে আসত। উড়ে উড়ে একটা ঠোকর মেরেই ডিগবাজি দিয়ে আবার সামনে চলে আসত। দুই তিন টা সাহসী কাক একসাথে চিলের উপর ঝাপিয়ে পরত। একসাথে তাল-গোল পাঁকিয়ে আকাশ থেকে ঝুপ করে নিচে পড়তে পড়তেই আবার সবাই আলাদা হয়ে উড়ে যেত। কি অসম্ভব সুন্দর ছিল তাদের এই স্টান্ট গুলো। আমি অবাক হয়ে দেখতাম তাদের মারামারি। মাঝে মাঝে মনে হত, আচ্ছা কাক গুলো যদি জানত চিল টা তাদের নয়, কোকিলের ডিম নিয়ে গেছে। তাহলে ও তারা এমন ভাবে চিল টাকে মারত? কি জানি…
বেচারা চিল না পারত পালটা আক্রমন করতে না পারত পালিয়ে যেতে। উড়তে উড়তে সমানে হিংস্র কাকেদের ঠোঁকর খেয়ে যেত। চিলকে আমি কখনোই জিততে দেখি নি। একদল মারমুখি কাকের সাথে একাকি চিল কি করেই বা পারবে। তখন খুব অমানবিক মনে হত ব্যাপার টা। আমি সব সময় চাইতাম চিল আজকে জিতে যাক। ছাদের এ’মাথা থেকে ঐ-মাথা দৌড়ে দৌড়ে ছোট ছোট ইটের ঢিল ছুড়ে মারতাম কাকের দলের দিকে। ছুঁ ছুঁ যাহ যাহ… কিন্তু ছোট হাতের ঢিল কাকেদের গায়ে লাগত না। হঠাৎ করে শুরু হওয়া ঝগড়া হঠাৎ করেই থেমে যেত। গরমের মধ্যে মারামারি করে সবাই ক্লান্ত হয়ে যার যার বাসায় চলে যেত। আমারও ক্ষুদায় পেট মোচড় দিয়ে উঠত, ঘামে ভেজা শরীর নিয়ে ছাদ থেকে নেমে আসতাম। নানার বকা খাওয়ার ভয়ে চোরের মত নানির কাছে গিয়ে নানা রকম বায়না করতাম।
এখন অনেক বড় হয়ে গেছি। এখন আর কিছুই করা হয় না। চোখ মেলে দেখা হয় না। ব্যস্ত সময় গুলো শুধু কেটে যাচ্ছে নিয়ম করে…

[বিকেল বেলা ফুলবাড়ির আকাশে ঝাঁকে ঝাঁকে চিল দেখা যায়। কিন্তু সেগুলো দেখে কেন জানি তৃপ্তি পাই না।]

 


গল্পঃ ফাইপির পথে

ভোর হতে এখনো অনেক দেরী। বাইরে ধুম বৃষ্টি হচ্ছে। থেমে থেমে পিলে চমকে উঠার মত বাজ আছড়ে পরছে এদিক ওদিক। তার সাথে জোড় ঝড়ো বাতাসের তান্ডব। এমন দূর্যোগপূর্ন রাতে ঘুমানোর কথা চিন্তাও করা যায় না। জুলাই মাসের পাহাড়ে মাঘের শীত নেমে এসেছে। বেড়ার ফাঁক ফোঁকর দিয়ে ঠেলে ঠুলে আসা তীক্ষ্ণ ঠান্ডা বাতাস গায়ে কাঁপুনি ধরিয়ে দিচ্ছে। আমি আর মাইনুল ভাই রামথন দাদার রান্না ঘরে চুলার কোনায় বসে প্রকৃতির এই বিষম রুপ তাড়িয়ে তাড়িয়ে উপভোগ করছি। রান্নাঘর টা বেশ বড়। পুরো বাসা টি বিরাট কয়েকটি গাছের গুঁড়ির উপর বানানো। কাঠের থাম গুলোতে আলকাতরা লাগানোর প্রয়োজন হয়নি, লাকড়ির ঝুল-কালিতেই তৈলাক্ত হয়ে প্রাকৃতিকভাবেই বার্নিশ হয়ে আছে। ঘরের পূর্ব দিকের বাঁশের তৈরী তাকে শয়ে শয়ে সেভেন-আপের বোতলে পানি সংরক্ষন করে রাখা। ট্যাপ খুললেই তো আর এখানে ঘরে বসেই পানি পাওয়া যায় না। এত দূরের ঝিড়ি থেকে প্রতিদিন পানি নিয়ে আসা সত্যি খুব কষ্টকর। ঘরের আরেকদিকে রান্নার হাড়ি-পাতিলের তাক। আর পশ্চিম কোনে মাটির প্ল্যাটফর্মের উপর লাকড়ির চুলা জ্বলছে। চুলার ঠিক উপরেই ছোট ছোট সাপ আর শুকরের মাংস আর চর্বির শুটকি শুকানোর জন্য রাখা । চুলায় এক টুকরো লাকড়ি দিয়ে আগুন টাকে আরেকটু উসকে দিতেই দেখি গায়ে চাদর জড়িয়ে রামথন দা ঘরে ঢুকছে।

রামথন দা কে দেখলেই মনে হয় মাইকেল এঞ্জেলোর খোদাই করা কোন নীরেট পাথরের গ্রীক বীর। চওড়া বুক, পেটে ছয় ভাজ, রোদে পুড়ে যাওয়া তামাটে শরীর। আরাকানী চেহারায় ক্ষুদে ক্ষুদে চোখ ভর্তি সাহস। এই রামথন দা’র বয়স পঞ্চাষোর্ধ বিশ্বাস করতে খুব কষ্ট হয়। প্রথম যেবার বাংলাদেশের সর্বোচ্চ ঝর্নার খোঁজে এখানে আসি তখনই তার সাথে আমার পরিচয়। তখন থেকেই আমার কাছে এক বিস্ময় এর নাম রামথন দা। এদিকে আসলেই তার রোমাঞ্চকর সব শিকার কাহিনী, জানা-অজানা সব পাহাড়ে উঠা, ঝর্না বেয়ে নামা, পাইথন শিকারের জন্য গুহায় ঢুকার অভিজ্ঞতা মন্ত্র-মুগ্ধ হয়ে শুনতে থাকি। তার ঘরে সাজিয়ে রাখা বিভিন্ন শিকারের ট্রফি গুলো দেখে রোমাঞ্চিত হই। পাহাড়ে কোথায় কোন ঝর্না আছে, কথায় কোন গুহা আছে সব তার নখদপর্নে। এবারও তার কাছে এক ঝর্নার খোঁজে এসেছি।

“আগামীকাল কি দাদারা ফাইপির দিকেই যাবা?” চুলার পাশে বসেই রামথন দা জিজ্ঞেস করল।

মাইনুল ভাই বলল- হ্যাঁ দাদা। কালকেই বের হয়ে যাব। আজকে যেই বৃষ্টি পরলো, ঝরনাতে কালকে অনেক পানি পাব। এটা মিস করতে চাই না।

রাস্তা এখন একটু ভালো পাবা। পারার জুম এবার ঐ পাহাড়ের ঢালের আগ পর্যন্তই কাটা হয়েছে। ঝোঁপ-ঝাঁড় কেটে একদম পরিষ্কার করা রাস্তা।

রাস্তা তো রাস্তাই দাদা। রাস্তার আবার ভালো-খারাপ কি?

আমার শরীর ভালো থাকলে তোমাদের সাথে যেতাম, আগে রোজ শিকারে যেতাম। এখন আর শিকার ও পাওয়া যায় না  এসব জায়গায় যাওয়া ও হয় না।

তোমার যাওয়া লাগবে না দাদা, তুমি শুধু একটা ম্যাপ একে দাও। সালেহীন ডায়রী আর কলম টা নিয়ে আসো, দাদা ম্যাপ এঁকে দিক।

খানিকটা গাঁইগুঁই করে অনিচ্ছা সত্ত্বেও অনেক কষ্টে আগুনের পাশ থেকে উঠে পাশের ঘর থেকে ডায়েরী আর কলম নিয়ে দাদার পাশে বসে পরলাম।

আচ্ছা দাদা জায়গাটার নাম ফাইপি হল কেন? আগুনে জমে যাওয়া হাতের তালু সেঁকতে সেঁকতে আমি জিজ্ঞেস করলাম।

ফাইপি অর্থ আমাদের ব্যোম ভাষায় হাতির বাধা। মানে যে রাস্তায় হাতি চলতে পারে না। অনেকদিন আগে ঐ পাহাড়ের খাঁজে আমরা একটা হাতি শিকার করেছিলাম। গভীর মনোযোগ দিয়ে ম্যাপ আঁকতে আঁকতেই জবাব দিল রামথন দা।

বলেন কি দাদা? হাতি? শিকারের গন্ধে আমি নড়েচড়ে বসলাম।

হ্যাঁ। যুদ্ধের ঠিক পর পর। একটা হাতি কিভাবে যেন এদিকে চলে আসে। জুমের পাহাড় সব তছনছ করে দিচ্ছিলো। আমার জুমের সব ভুট্টা একরাতেই শেষ করে দিয়েছিল। পুরো তিন রাত তিন দিন লেগেছিল শিকার করতে।

কি দিয়ে শিকার করলেন দাদা?

দাঁড়ান দাদা, গল্প একটু পরে শুরু করেন। আগে একটু চা বসাই। চা আর চুরুট ছাড়া শিকারের গল্প জমে না, সওৎসাহে চুলায় চা বসিয়ে দিল মাইনুল ভাই।

 

কড়া লিকারে চুমুক দিয়ে বললাম, এইবার বল দাদা- কিভাবে শিকার করলা?

চায়ে চুমুক দিয়ে দাদা শুরু করল তার হাতি শিকারের কাহিনীঃ

বর্ষা তখনও শেষ হয় নাই। সেপ্টেম্বর মাস ছিল বোধ হয়। হঠাৎ একদিন সকালে জুমে গিয়ে আমার মাথা খারাপ হয়ে গেল। জুমের সব ফসল মাটিতে মিশে গেছে। কোন ধান গাছ নাই। একটা ভুট্টা নাই। সব শেষ হয়ে গেছে।

গল্প বলতে বলতে রামথন দাদা যেন অতীতে ফিরে গেলেন। প্রচন্ড ক্রধেই বুঝি তার চোখ দুটো চকচক করছে। আর ক্রোধ হবেই না বা কেন? কত অমানুষিক পরিশ্রম করে তারা জুমের পাহাড় কেটে পরিষ্কার করে,  বীজ বোনে, ফসল ফলায়। আগামী পুরো বছরের ভাত তাদের এই পরিশ্রমের উপর নির্ভর করে। অনা-বৃষ্টি, অধিক বৃষ্টি, বন্য শুকর, ভাল্লুক , বুনো হাতি, ইঁদুর বন্যা- যে কারনেই ফসল নষ্ট হোক না কেন এর ভুক্তভোগী তো তাদের কেই হতে হয়।  ভাতের অভাব কি জিনিস, দূর্ভিক্ষ কি জিনিস  সেটা লিখে বুঝানো যাবে না। সেই পরিস্থিতিতে নিজে না পরলে কেউ বুঝবেও না। এইসব প্রতিকূলতার সাথে এখনো তাদের প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করে যেতে হয়। জীবনের এই সংগ্রামী কঠোরতাই তাদের বাঁচিয়ে রেখেছে।

পায়ের ছাপ দেখে বুঝলাম একটাই বুনো হাতি, কোন ভাবে দল ভেঙে খাওয়ার লোভে এদিকে চলে আসছে। পায়ের ছাপ দেখে কিন্তু চেনা যায় কোনটা শুকর, কোনটা মায়া হরিন, কোনটা ভাল্লুক। সেই রাতে গীর্জার সামনের মাঠে সবাইকে নিয়ে জরুরী মিটিং বসল। কারবারীকে বললাম হাতিটা খাবারের দেখা পেয়ে গেছে। তাড়ালেও ঐটা বারবার আসবে। যেভাবেই হোক হাতিটাকে মারতেই হবে। আর কেউ না হোক আমি একা হলেও ঐটারে শিকার করতাম। ঐ রাতেই পারার সব জোয়ান গাদা বন্দুক আর বল্লম নিয়ে হাতির খোঁজে বের হয়ে গেলাম। তিন রাত তিন দিন কেউ ঘুমাতে পারি নাই। সারারাত জেগে পাহারায় ছিলাম সব জুম পাহাড়ে। ঠিক একদিন পর মাঝরাতে হাতিটাকে দেখতে পাই। বিশাল শরীর, ছোট ছোট চোখ। মশাল জ্বালিয়ে সাথে সাথে সবাই হাতি টাকে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলি। আগেই প্ল্যান করেছিলাম, হাতিটাকে তাড়িয়ে প্রাংশায় নামিয়ে আনব আর যেই পাহারের খাঁজে কালকে তোমরা যাবা সেখানে হাতিটাকে আটঁকে ফেলব। ঐ খাঁজ টা আমার আগেই দেখা ছিল। ঐখানে অনেক আগে শিকার করতে যেতাম। ওখানে অনেক উল্লুক আর পাখি পাওয়া যেত। খাঁজের উপরের পাহাড়ে অনেক বিশাল বিশাল পাথর ছিল। আমরা কয়েকজন পাহারের উপরে চলে গেলাম। বাকীরা মশাল জ্বালিয়ে হাতি টাকে ধাওয়া দিয়ে পাহাড়ের খাঁজে নিয়ে আসলাম। হাতিটার কোন উপায় ছিল না। খাঁজের ভিতর আটকা পরে গেল। হাতি খাজের ভিতর যেই ঢুকলো উপর থেকে বিশাল পাথর গুলো বাকিরা গড়িয়ে নীচে ফেলে দিল। এভাবেই হাতিকে খাঁজে আটকে ফেললাম। বিশাল পাথর গুলো ডিঙগিয়ে পিছনে আর যাওয়ার রাস্তা ছিল না। তারপর কাজ সহজ হয়ে গেল। বন্দুক দিয়ে গুলি করে আর বল্লম দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে মেরে ফেলি।  কালকে গেলে দেখতে পাবা বিশাল বিশাল পাথর একটার উপর একটা পরে আছে।

শিকার করা হাতিটা কি করলেন পরে দাদা? আমি আর বিস্ময় চেপে রাখতে পারলাম না।

কেটে কেটে পারায় নিয়ে আসলাম। সারারাত নাচ-গান আর প্রার্থনা সঙ্গীত গেয়ে উৎসব করি। হাতির মাংস খেতে স্বাদ নাই। কেমন যেন রাবারের মত ছাবড়া ছাবড়া। বিস্বাদ মাংসের স্মৃতি মনে পরে যাওয়ায় রামথন দা’র মুখ বেঁকে গেল।

প্রথম প্রথম এসব শুনে গা কেমন যেন গুলিয়ে উঠত। কিন্তু এখন আর তেমন হয় না। পাহাড়ী  এই বুনো পরিবেশের সাথে নিজেকে বেশ মানিয়ে নিয়েছি। মুগ্ধ হয়ে গল্প শুনে গেলাম। নিজের স্বত্তা হারিয়ে গেল প্রাচীন এক শিকারী দলের মাঝে। কেন যেন খৃষ্টের জন্মের দশ হাজার বছর আগের ম্যামথ শিকারের ছবি ভেসে উঠল কল্পনায়।

শিকারের গল্পের সাথে সাথে রামথন দা’র ম্যাপ আঁকাও শেষ হয়ে গেল। আমি আর মাইনুল ভাই ভালো ভাবে রাস্তা আর আশে-পাশের পাহাড় সম্পর্কে ধারনা নিয়ে নিলাম।

আমি ঘুমাতে গেলাম, তোমরাও এখন শুয়ে পর। অনেক রাত হয়ে গেছে। এই বয়সে আর বেশীক্ষন জেগে থাকতে পারিনা- বলেই দাদা ঘুমাতে চলে গেল।

আর এক রাউন্ড চা শেষ করে আমরাও উঠে পরলাম। পাশের ঘরের মেঝেতে বেশ কয়েকটা চাদর মেতে বিছানা করে নিলাম দুজন। এটা তাদের বসার ঘর। পাশেই দুটি ছোট ছোট ঘরে রামথন দাদা আর তার ছেলে তাদের পরিবার নিয়ে ঘুমিয়ে আছে। চাদর মুড়ি দিয়ে গুটিসুটি করে শুয়ে পরলাম। তখন চোখে ছিল হাতি শিকারের ছবি। কল্পনায় ভেসে উঠল শিকারের সময় হাতিটির বুকফাটা বিদীর্ন চিৎকার আর আর বেঁচে থাকার জন্য তীব্র আস্ফালন। বাহিরে তখনো চলছিল আকাশের একটানা আর্তনাদ।

ঘরের নীচে শুকর-মুরগীর চেঁচামেচি আর ঘরের ভিতর পিচ্চিপাচ্চা দের হাউকাউ শুনে যখন ঘুম ভাঙলো তখন অনেক বেলা হয়ে গেছে। জিপিএস বের করে দেখলাম সকাল আট টা বাজে। ধড়ফড় করে উঠে বসলাম। মাইনুল ভাই ও দেখলাম উঠে চাদর ভাঁজ করছে। ঘুম মাখা চোখে চাদর ভাঁজ করতেই গরম ধোঁয়া ওঠা চা এসে গেল।

চা শেষ করেই একটা ঝোলা ব্যাগে দুই প্যাকেট নুডলস, একটা হাড়ি, ছুরি আর পানির বোতল নিয়ে ট্রেকিং এর জন্য তৈরী হয়ে গেলাম। রামথন দা’র ঘরেই আমাদের ব্যাকপ্যাক দুটো রেখে যাব। গত রাতেই পরিকল্পনা করেছিলাম ফাইপি ফলস দেখে আবার আগামীকালই থাইকিয়াং পাড়ায় ফিরে আসব। তাই এত ভারী দুটো ব্যাকপ্যাক নিয়ে ট্রেকিং করার কোন মানেই হয় না।

ভোরেই বাসার সবাই জুমে কাজ করতে চলে গেছে। রওনা দেবার সময় দাদার সাথে আর দেখা হয় নি। ঘর থেকে বেড়িয়ে ট্রেকিং যখন শুরু করি তখন জিপিএস এ নয়টা বেজে গেছে। একদম পরিষ্কার আকাশ। ঠান্ডা বাতাসের মধ্যে সূর্যের আলো লেগে বেশ আরাম লাগছে। এমন আবহাওয়ায় সারাদিন কোন রকম ক্লান্তি ছাড়াই ট্রেকিং করা যায়। চারিদিকে সবুজ আর সবুজ। রাতের বৃষ্টি পরিবেশকে সজীবতা দান করে গেছে। গাছের পাতা গুলোর ক্লোরোফিলে সূর্যালোক পরে চিকচিক করছে। বিরাট পাড়া থাইকিয়াং। উত্তরে মাউন্ট কেওক্রাডাং, পূর্বে মদক রেঞ্জ, পশ্চিমে আছে বিখ্যাত মিজু পাহার “ক্যাপিটল” আর দক্ষিনে তাজিনডং। পাসিং পারা থেকে গাড়ীর রাস্তা পশ্চিম দিক থেকে তাইকিয়াং পারা পর্যন্ত এসে গেসে। গরমের সময় এখানে চান্দের গাড়ী মালামাল নিয়ে আসে। পাসিং পারা থেকে থাইকিয়াং পারায় প্রবেশ করার মুখে চোখে পরে পুরানো এক সমাধিক্ষেত্র। সামনেই একটা ভাঙা বাশেঁর বেঞ্চ। বেঞ্চের বা’পাশ দিয়ে চওড়া একটা রাস্তা চলে গেছে তাম্লো পারার দিকে। প্রায় ষাট ঘর পরিবার বাস করে এই পাড়ায়। সবাই মূলত ব্যোম জাতিগোষ্ঠীর। পাহাড় কেটে মাটি সমান করে তারা মাচার উপর বাঁশ, গাছের গুড়ি আর ছনের ছাউনি দিয়ে তাদের ঘর বাঁধে। চওড়া লাল মাটির রাস্তার দুই পাশে সারি সারি মাচার ঘর। প্রতিটি ঘরের পাশেই স্থুপ করে রাখা লাকড়ি আর মুরগীর খোয়াড়। এই পারার মত এত গরু অন্য কোন পারায় আমার চোখে পরেনি। সারাদিন তারাই রাস্তা দখল করে রাখে। শুকরের আধিক্যের কারনেই হয়ত পারাটা মোটামটি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। খেয়াল করলাম শহুরে আধুনিকায়নের হালকা ছোঁয়া এদিকেও কিছুটা স্পর্শ করে গেছে। কয়েকটি ঘরে চকচকে টিনের চাল সেটাই প্রমান করে। পারার প্রায় সব কটি ঘরের ছাউনিতে শোভা পাচ্ছে সোলার প্যানেল। উজ্জ্বল রোদের স্পর্শ পেয়ে ঝিলিক দিয়ে উঠছে সিলিকনের বর্গ গুলো। সন্ধ্যা নামলেই পাহারে এখন আর অন্ধকার ঝুপ করে নেমে আসে না। এনার্জী সেভিং বাল্ব গুলো আলোকিত করে রাখে পারার ঘর গুলো। একটা দোকান ঘরে ল্যাপটপ ও দেখলাম এইবার। সন্ধ্যা নামলেই পারার লোকজন ল্যাপটপে সিনেমা-নাটক দেখে সময় পার করে। দেখে মনে হয় প্রযুক্তি এখানে অযথাই অনুপ্রবেশ করছে। মন্তব্য টা বিতর্কিত হয়ে গেল মনে হয়। এটাও হয়ত আমাদের এক ভন্ডামী। কিন্তু আধুনিকতার লেবাস পরে স্বীয় জাতিস্বত্তাকে বিসর্জন দিয়ে দেয়া টা আমি অন্তত মেনে নিতে পারছিলাম না। রামথন দা’কে একবার জিজ্ঞেস করেছিলাম, “দাদা সবাই তো সোলার লাগায় ফেললো, তুমি কবে লাগাবা?” তার কথায়, তার বাপ দাদা যেভাবে থাকতেন তিনিও ঠিক সেভাবে থাকতে চান। এগুলো জীবন কে নাকি অহেতুক জটিল করে ফেলে। অতিরিক্ত চিন্তায় মাথা ব্যাথা করে। ব্যাটারী পাল্টাও, নিয়ম মত পানি দাও…ধুর ধুর। শুধু সময় নষ্ট। করার এক বছর হয়ে গেল, এখনো উনি প্যানেল লাগান নাই, এখনো তাই তার ঘরে প্রাচীন কুপি বাত্তি জ্বলে। এইসব হাবিজাবি ভাবতে ভাবতে পাড়ার সব ঘর ছাড়িয়ে সদ্য তৈরী করা গীর্জার সামনে চলে আসলাম। গীর্জার পাশ দিয়ে ঠিক উত্তরে সুনসাং পারার রাস্তা চলে গেছে। পাশ দিয়ে আর একটি রাস্তা পূর্বে থিনদ্যোলতে পাড়ার দিকে চলে গেছে ম্যাপ ধরে ধরে আমরা সেই রাস্তায় ট্রেকিং শুরু করলাম।

 

পনের বিশ মিনিট ট্রেকিং করতেই আমরা পাড়ার সীমানা বেড়া টপকে উঁচু জুম পাহাড়ে উঠা শুরু করলাম। রাস্তা ক্রমেই খারাপ হয়ে যাচ্ছে। এটেল মাটি বৃষ্টির পানি পেয়ে প্রচন্ড পিচ্ছিল হয়ে আছে। আমার পায়ের স্যান্ডেল একটু পর পর স্লিপ কাটায় মাইনুল ভাই থেকে ক্রমশ পিছিয়ে যাচ্ছি। কি কাঁদা আর কি পিচ্ছিল, মাইনুল ভাই দেখি তরতর করে পাহাড় বেয়ে উঠে যাচ্ছে। সূর্যের তেজ বাড়ার সাথে সাথে আরামের ভাব টুকুও মিলিয়ে গেল। মাথায় গামছা পেঁচিয়ে আবার হাঁটা শুরু করলাম। সামনের একটা চড়াই উঠেই প্রকৃতির সৌন্দর্য দেখে একদম থতমত খেয়ে গেলাম। যতদূর চোখ যায় শুধু জুমের পাহাড়। যে জমির ধান কাটা হয়ে গেছে সেগুলো বাদামী হয়ে আছে। বাকী সব সবুজ। রঙের এই আশ্চর্য কন্ট্রাস্ট সত্যি ভয়ংকর সুন্দর। দূরের মদক রেঞ্জের পাহাড় গুলো অহংকারীর মত মাথা উঁচু করে দাড়িঁয়ে আছে। জুমের রাস্তা দিয়ে আমরা আরো এগিয়ে গেলাম। রাস্তার দু’পাশেই সারি সারি জুম ঘর। আরো ঘন্টা খানিক ট্রেকিং করে শেষ জুম ঘর টিও পার হয়ে গেলাম। রাস্তা এখন ক্রকশ নীচের দিকে নামছে। রাস্তা হঠাৎ করেই খারাপ হয়ে গেল। একটা পুরানো জুমের রাস্তা নীচে নেমে গেছে। ম্যাপ অনুযায়ী এভাবে নীচে নেমে গেলে আমরা প্রাংশা খালে নেমে যাব। এতক্ষন কোন জোঁকের দেখা পাই নি কিন্তু এই জঙলের রাস্তায় এখন আর মাফ নাই। পা থেকে জোঁক সরাতে সরাতে নীচে নামতে শুরু করলাম। মাঝে মাঝেই পাহার একদম নব্বই ডিগ্রি খাড়া হয়ে নেমে গেছে। গাছের শিকর আর ডাল ধরে নীচে নামছি। আবাক করার বিষয় হল, যখনই নামার জন্য কোন সাপোর্ট দরকার হবে, ঠিক সেই জায়গাটাতেই কেন যেন কাঁটা গাছ থাকবেই। এটা পরীক্ষিত সত্য। এবার ও এর অন্যথা হল না। কিছুক্ষন নামতেই শ্বাস ঘন হয়ে গেল। কপাল বেয়ে দরদর করে ঘাম বেয়ে পরছে। পাহার বেয়ে নামার সময় হাঁটুর উপর অনেক প্রেশার পরছিল। এমন সময় গুলোতে মনে হয়, ধুর ছাই কেন যে আসলাম। এই ছুটিতে আচ্ছামত ঘুমানো যেত বাসায়। কিন্তু পরক্ষনেই যখন নীচে ঝিরির আওয়াজ কানে আসে নিজেকে অনেক শক্তিশালী মনে হয়। নতুন উদ্যোমে আবার ট্রেকিং শুরু করি। এই এত কষ্ট আর ঘামের পুরষ্কারের নাম প্রাংশা। সেই মুহূর্তে নিজেকে অনেক ভাগ্যবান মনে হয়। এই জীবনের জন্য, এই আনন্দটুকুর জন্য।  দু’হাজার ফিট নামতে আমাদের প্রায় আধা ঘন্টা লেগে গেল, কিন্তু নামার সময় মনে হচ্ছিলো যেন যুগ যুগ ধরে নামছি। ইতোমধ্যেই আমাদের দুই পা রক্তে ভেসে গেছে। কিন্তু সব ক্লান্তি গুলে গেলাম প্রাংশার রূপ দেখে। এই সেই প্রাংশা-রামাক্রি। নির্মল পানির স্রোত পাথুরে বোল্ডারে বাধা পেয়ে চোখের সামনেই রুক্ষ হয়ে যাচ্ছে। ছোট বড় পাথরে বাড়ি খেয়ে গর্জন করছে বিপুল পানির স্রোত। প্রাংশার পাড়ে ছোট একটা চা বিরতি নিলাম। খড়-কুটো জোগাড় করে মুহুর্তের মধ্যেই আগুন জ্বালিয়ে ফেলল মাইনুল ভাই।

চায়ে চুমুক দিতেই আবার চাঙা হয়ে গেলাম। প্রাংশা ধরে দক্ষিনে হাঁটা শুরু করলাম। প্রায় এক কিলোমিটার পর পশ্চিম দিক থেকে একটি ঝিড়ি মুখ প্রাংশায় এসে মিশেছে। এটাই ফাইপি ঝিড়ি। এখন এই ঝিড়ি ধরেই আমরা আবার উপরে উঠে যাব। এই সেই পাহাড়ের খাঁজ। এখানেই রামথন দা হাতি শিকার করেছিল। এই খাঁজের শেষ মাথায় একটা ওয়াটার ফল আছে।

ভয়ানক ঝোঁপঝাড় পেড়িয়ে ফাইপি ঝিড়ির কিছুটা উপরে উঠতেই দেখা পেলাম সেই বিশাল আকারের পাথর গুলোর। হাতিটিকে আটকানোর জন্য যেগুলো পাহাড়ের উপর থেকে ফেলে দেয়া হয়েছিল। আসলেই বিশাল বিশাল পাথর। এক্টার উপর একটা পরে আছে। এত সময়ের পর পাথর গুলোর উপর শ্যাওলা জন্মে গেছে। হাতি তো পরের কথা খর্বকায় মানুষ হয়ে শ্যাওলা ধরা এই পিচ্ছিল বিশাল পাথরের পাঁচিল কিভাবে পার হব সেই চিন্তাতেই আচ্ছন্ন হয়ে গেলাম। মাইনুল ভাইকে দেখি তরতর করে পাথর বেয়ে উপরে উঠে যাচ্ছে। কি যে লাগানো আছে উনার পায়ে কে জানে। চুম্বকের মত উনার পা পাথরের দেয়ালে আঁটকে যায়। মাঝে মাঝে উনাকে স্পাইডার ম্যান মনে হয়। উনি পারলে আমি পারব না কেন? জিদ চেপে গেল মাথায়। আমিও সামনে পিছে চিন্তা না করে উনার নকল করে উঠে যেতে লাগলাম। মাইনুল ভাই বলে পা স্লিপ করার কথা বেমালুম ভুলে যাও, তাহলেই আর পা স্লিপ কাটবে না। এই কথার বাস্তবিক উদাহরন পাচ্ছিলাম পাথরের দেয়াল ডিঙানোর সময়। কিছু কিছু জায়গায় আবার দুই পাথরের সংকীর্ন চিপা দিয়ে শরীর গলিয়ে সামনে এগুতে হচ্ছে। পাথরের নীচে মাথা ঢুকানোর সময় ভয়ভয় লাগে। যদি মাথা ভর্তা হয়ে যায়? একসময় পাথরের বাধা পার করে ঝর্নার ঠিক সামনে পৌছে গেলাম। ছোট্ট কিন্তু অদ্ভুত সুন্দর একটা ঝর্না। ঝর্নার ঠিক নীচে একটা বিশাল পাথরের দিকেই সবার আগে চোখ চলে যায়। ডুবন্ত জাহাজের আকৃতির পাথর টাইটানিকের কথাই মনে করিয়ে দেয়। আকারে ছোট হলে কি হবে এই ফাইপি ঝর্নাই প্রাংশা-রামাক্রির একটি অন্যতম প্রমিনেন্ট সোর্স। ঘন জঙল পাহারের খাঁজ টাকে যেন চারপাশ থেকে চেপে রেখেছে। নাম না জানা পাখিদের কিচিরমিচির, ঝিঁঝি পোকার প্রণয়সঙ্গীকে খোঁজার জন্য করা বাঁশির মত তীক্ষ্ণ আওয়াজের সাথে পাথরের দেয়ালে পানির অবিরাম আঁছড়ে পরার আওয়াজ জায়গাটাকে রহস্যময় করে রেখেছে। চিনে জোঁকের ব্যাথা আর শরীর জুড়ে ক্লান্তি দূর করতে তৃষ্ণার্থের মত ফাইপির সৌন্দর্য পান করতে লাগলাম।

 

সন্ধ্যা নামতে আর দেরী নেই, চল সালেহীন এবার রওনা দেয়া উচিৎ। ফাইপি ঝর্নার ঠিক পাশ দিয়েই একটি ফাটল উপরের পাহাড়ে উঠে গেছে। সিদ্ধান্ত নিলাম এই ফাটল দিয়েই উপরের পাহাড়ে উঠে যাব। এই পাহাড়ের উত্তরেই শেষ জুম ঘর টা আছে। রাস্তা খুঁজে পেতে খুব একটা সমস্যা হবে না। যেই ভাবা সেই কাজ। ফাটল ধরে আমরা দু’জন পাহাড়ের উপরে উঠে গেলাম। বুনো লতা আর ঝোঁপের জঙল ভেদ করে, শত শত জোঁকের কামড় খেয়ে আমরা উত্তরদিক বরারবর ট্রেকিং শুরু করলাম। পিকে পৌছে নিঃশ্বাস একটু স্বাভাবিক করার জন্য থামতেই দেখি সামনে মদক রেঞ্জের এক অদ্ভুত দৃশ্য। ঘন কালো মেষ পুরো পূব আকাশ ঢেকে ফেলেছে। মদকের পিক গুলো ধীরে ধীরে গিলে ফেলছে দৈত্যাকার মেঘ গুলো। চারিদিকে কেমন ভ্যাপসা গুমোট ভাব। হাজার হাজার পাখি আর উল্লুকদের আর্ত চিৎকারে পরিবেশ কেমন যেন ভীতিকর হয়ে গেল। যে কোন সময় অঝোরে বৃষ্টি শুরু হয়ে যাবে। বৃষ্টির মধ্যে এই রাস্তায় ট্রেকিং করতে কেমন মজা হবে কল্পনা করতেই বুঝি আমাদের হাঁটার গতি দ্বিগুন হয়ে গেল। জিপিএস এ শেষ জুম ঘর টা মার্ক করা ছিল বলে রাস্তা খুঁজে পেতে তেমন সমস্যা হল না। বৃষ্টি আসার আগেই আমরা জুম ঘরে পৌছে গেলাম। আকাশ ইতোমধ্যেই কালো হয়ে গজরাচ্ছে। কিছুক্ষনের মধ্যেই শুরু হয়ে গেল প্রকৃতির তান্ডব।

আজকে রাতে এই জুম ঘরেই থেকে যাই, কি বল? কালকে একবারে শিলোপি ঝিড়ি টা এক্সপ্লোর করে আসব। যা আছে কপালে। কোন সমস্যা হবে নাতো?

কি যে বলেন ভাই। সমস্যা কিসের। সাথে টেন্ট, স্লিপিং ব্যাগ, চাল-ডাল কিছু নাই। বেশ থ্রিলিং একটা ব্যাপার।  এই বৃষ্টিতে পাড়ায় ফেরার কোন মানেই হয় না। খুশি হয়ে আমি উত্তর দেই।

রাতের খাবার রান্না আর পান করার জন্য তাই মহা উৎসাহে রেইন কোট পরে কলা পাতা দিয়ে বৃষ্টির পানি জমানো শুরু করে দিলাম।

মাইনুল ভাই লাকড়ি জ্বালিয়ে চুলায় চা বসিয়ে দিল। শরীরে কাঁপুনি তোলা এমন বৃষ্টির মধ্যে এক মগ গরম ধোঁয়া ওঠা চায়ে চুমুক দিলে মনে হয় জীবন টা কতই না মধুর।

আগামীকাল আবার নতুন একটি দিন, নতুন কোন জায়গা, অন্য কোন ঝর্না…

 


[True Love]- [সত্যিকারের ভালোবাসা]

অনেকদিন পর আজ ঘর থেকে বের হলাম। পুরনো বন্ধুদের সান্নিধ্য, খুব চেনা নির্জন গ্রামের পিচ ঢালা রাস্তা, বিদায়ী শীতের নিস্তব্ধ রাত, আকাশে ছাড়া ছাড়া মেঘ আর বিচ্ছিন্ন কিছু তারার ফ্যাকাসে আলো- বেশ ভালো লাগছে, বহুদিন পর আপন জায়গায় ফিরে আসলে যেমন লাগে আর কি।  মনে হয় অমাবস্যা চলছে, চাঁদের দেখা নাই। রাস্তার দুই পাশে ঘন গাছের সারি। যতদূর চোখ যায় শুধু ক্ষেত আর ক্ষেত। নির্জন পথে  হাটঁতে হাঁটতে এগিয়ে যাচ্ছি। কেমন যেন লাগছে, ট্রলার দিয়ে নদী পার করার সময় আপন খেয়ালে হারিয়ে যাচ্ছিলাম বারবার। আমার সময় শেষ হয়ে আসছে… তাড়াতাড়ি সব গুছিয়ে ফেলতে হবে। চলে যেতে হবে অনেক দূর…

 

ঔ দাঁড়া। পা ব্যাথা করতেসে। একটু বসি, বলে একটা কালভার্টের রেলিং এ রাজিব বসে পরল।

আমিঃ ক্ষেত গুলা এত অন্ধকার কেন? আজকাল ক্ষেতের পাম্প হাউসে কেউ বোধ হয় ৬০ ওয়াটের ল্যাম্প জ্বালায় না, নাকি কারেন্ট ই নাই???

রিয়াদঃ বালের আবার কারেন্ট।

জবাব দিতে ইচ্ছা করল না। অন্যসময় হলে গালাগালি করে সরকার বিরোধী কিছু বক্তব্য দিতাম হয়ত। বাকিরা ও একদম চুপ মেরে আছে আজকে। আবার চারিদিকে সব চুপ হয়ে গেল। যা যার চিন্তায় ডুবে গেলাম। গাড় অন্ধকারে শুধু ৩টা বেনসন থেমে থেমে জ্বলে উঠছে। আমিও সাথে থেকে প্যাসিভ স্মোকিং করছি আর ভাবছি এমন ও সময় ছিল তামাকের গন্ধে গা গুলাতো, আর এখন এই কড়া গন্ধটা বেশ ভালই লাগে। সিগারেট খেতে গিয়ে কবে যেন আব্বুর হাতে ধোলাই খেলাম…?

…সালেহীন ভাই। আশিকের ডাকে তন্দ্রা ভেঙে গেল।

আমিঃ হু!!

আশিকঃ ভাই আপনার ভবিষ্যতবানী ঠিক হয়ে গেল।

আমিঃ অবাক হয়ে বললাম, কিসের ভবিষ্যতবানী??? !!!

আশিকঃ আপনি আমাকে নিয়া যে ভবিষ্যতবানী করসিলেন সেটা ফলে গেসে।

আশিকের গলায় কেমন যেন বেদনার সুর টের পেলাম। বুঝলাম খারাপ কিছু হয়েছে, কিন্তু ধরতে পারলাম না। আজকাল আমার কিছুই মনে থাকে না।

আমিঃ কি হইসে বল।

আশিকঃ লাকাপিপি তো খায়া গেলাম।

আমিঃ শালা ভনিতা না কইরা কি হইসে খুইলা বল।

আশিকঃ ফারিয়া আমারে লাকাপিপি দিসে।

আমিঃ কোন ফারিয়া?

আশিকঃ ভাই !!! ঐ যে, জার্মানী।

আমিঃ শিট… আশিক। dass die deutschen Mädchenditched Sie? [That German girl ditched you?] হাহাহাহাহা।। মজা পাইলাম। গুড ফর ইউ। বাঁইচ্চা গেলি।

আশিকঃ ভাই, এভাবে বইলেন না। আমি ওরে খুব ভালোবাসতাম। আমার ট্রু লাভ ছিল। অন্য কোন মেয়ের জন্য আমি এমন ফিল করি নাই। খুব খারাপ লাগতেসে। ও কি কারনে স্বম্পর্ক টা শেষ করল সেটাও বলে গেল না। এটার জন্যই আরো বেশী খারাপ লাগতেসে।

আমিঃ খারাপ লাগার কি আসে? আজিব।

আশিকঃ ভাই খারাপ লাগব না?? তিন বছরের প্রেম।আমি ১০০% কমিটেড ছিলাম, ওর জন্য সব কিছু করতে রাজী ছিলাম আমি। ও আমার ট্রু লাভ ছিল।

আমিঃ বালের লাভ ছিল। এর আগে কয়বার ট্রু লাভ করসোস ??

আশিকঃ ভাই সিরিয়াসলি। আমি জীবনে অনেক ফাইজলামি করসি, অনেকের সাথেই আমার রিলেশন ছিল। কিন্তু অনেস্টলি বলতেসি এটার আগে আরো তিন জনকে আমি ভালোবেসে ফেলসিলাম।

আমিঃ হাহাহাহা। মাত্র তিনজন। গুড গুড। তোর কি মনে হয় একবার একজনকে ভালোবেসে ফেললে পরবর্তীতে আরেকজনকে ভালোবাসা যায়?

আশিকঃ কেন যাবে না? আমি বিশ্বাস করি ট্রু লাভ অনেকের সাথেই করা যায়। যারা ছেড়ে চলে যায় যাওয়ার সময় ভালোবাসা তো ফেরত দিয়েই যায়।

আমিঃ হাহাহাহা। কঠিন ডায়লগ। রিফান্ডেবল ভালোবাসা।হাহাহা… ছ্যাকা খাইলেই মানুষ এমন কঠিন ডায়লগ ছাড়তে পারে। আমরা শালা একটা পাইনা আর তুই চার চার বার ট্রু লাভ কইরা ফেললি?? তা তোর  ট্রু লাভের কাহিনী গুলি শুনি…কেমনে কি হইল।

………………………………………………………………………………………

আসল কাহিনীর শুরু আসলে এখান থেকে। এখন আমরা তিনটি গোপন প্রেম কাহিনী পড়ব। একজন টিনেজ ছেলের মনে চলতে থাকা প্রেম-ভালোবাসা বিষয়ক চিত্র গুলো বুঝার চেষ্টা করব।

……………………………………………………………………………………..

[ট্রু লাভঃ আনিকার হাতে হাতেখড়ি]

তখন আমি ক্লাস নাইনে পড়ি। ইংলিস পড়তে একটা ব্যাচে যেতাম। লেখাপড়া করতাম না। রেজাল্ট খারাপ করতাম। সবার সামনে স্যার খুব পঁচাইত। আনিকা কেন জানি আমাকে একদম দেখতে পারত না। লেখাপড়া নিয়ে অনেক বাজে ভাবে আমাকে পঁচাইত। খোটা দিত। খুব খারাপ লাগত আমার। কিন্তু আমি তার কিছুই জবাব দিতাম না। শুধু চুপ করে ওর দিকে তাকায় থাকতাম। একদিন ওর সেলফ রিয়েলাইজেশন হয়। আস্তে আস্তে আমার সাথে ফ্রেন্ডশিপ করে। আমারো তাকে ভালো লেগে যায়।

এভাবে কিছুদিন চলার পর একদিন আমাকে বলে চল বাসায় গিয়ে লেখাপড়া করি। আজকে কেউ নাই। [আহেম] … এভাবে প্রায় প্রতিদিন আমরা লেখাপড়া করতাম। ওর মা-বাবা চাকরি করত। খালি বাসায় ওর খারাপ লাগত। বন্ধুর মত ওকে তখন সঙ্গ দিতাম। সারাদিন ওর কথা ভাবতাম।

[মাঝখান দিয়ে রাজিব ফুট কাটল, সঙ্গ দিতে দিতে সঙ্গম করোস নাই?]

আশিকঃ তাওবা তাওবা। আমি ভালো পোলা ভাই। হাল্কা ফুল্কা কিস টিস, হাত ধরে স্বপ্ন দেখা, বাচ্চা-কাচ্চার নাম ঠিক করা এই পর্যন্তই ছিলাম।

রিয়াদঃ আগে বার জলদি, টাইম নাই

…এভাবে প্রায় এক বছর আমরা গ্রুপ স্টাডি করলাম। একদিন ওর মা অফিস থেকে তাড়াতাড়ি ফিরে আসে আর আমাকে ঘরে আবিস্কার করে। আমার ১৪ গুস্টির নাম ঠিকানা নিল সেদিন।

প্রথম কয়েকদিন খুব ভয়ে ভয়ে ছিলাম। বাসায় ভদ্র ছেলের মত লেখাপড়া করতাম। একদিন আমার বাপ আইসা জিজ্ঞাস করল আনিকা নামের কোন মেয়েকে চিনি কিনা? ওর বাসায় যাইতাম কিনা? কইলাম হা যাইতাম। অস্বীকার কইরা কোন লাভ হইত না। দেন কইল, ঠিক আসে। যা হওয়ার হইসে। আর যাইস না। এরপর আমি টিভি দেখতে বইসা গেলাম। আর বাপ-মা লাগল ঝগড়া। তুমি ছেলেটারে নস্ট কইরা ফেলতাসো। বাপ কয়, এই বয়সে একটু আধটু করবেই। আমিও করতাম।

এরপর একদিন ওর সাথে আমার ব্যাচে দেখা। জিজ্ঞাস করলাম কেমন আছ? কইল ওর মা সেদিন বেডমিন্টনের ব্যাট দিয়ে পিটাইসে। আবার যদি আমার সাথে কথা বলে তাহলে ওর বিয়ে দিবে। মার খায়া ঐ মাইয়া এখন আর আমারে চিনে না। এই হইল ওর ট্রু লাভ। অনেকদিন আনিকাকে আমার মনে আগলে রাখসিলাম। অনেক বুঝানোর চেষ্টা করসি। অনেক মিস করতাম আনিকাকে। কিন্তু দিপা আপু এসে সব পালটে দিল।

 

[ট্রু লাভঃ দিপা আপুর ছলনা]

আমি তখন মাত্র কলেজে ভর্তি হইসি। আনিকার দেয়া ক্ষত তখনো শুকায় নাই। বাপ নতুন একটা মোবাইল কিনে দিল।কিন্তু তখন আমার বন্ধু-বান্ধবের কাছে মোবাইল ছিল না। ঠিক তেমন একটা সময়ে দিপা আপু আমার জীবনে এন্ট্রি মারল। উনি তখন ভিএনসি সেকন্ড ইয়ারে পড়ত। আমার বাপের কাছে ব্যাচে পড়তে আসত। সেখানেই পরিচয়। আমার হাতে একদিন মোবাইল দেখে আমার নাম্বার নিয়ে যায়। তারপর প্রায়ই রাতে কল দিতেন। আমি কম দিতাম। আস্তে আস্তে আমাদের কথাবার্তা রোমান্টিক দিকে টার্ন নিয়ে নিলো। এটা কিভাবে হল আমি বুঝতেই পারলাম না। অনেক মেসেজ দিতাম। উনি অভয় দিতেন, বয়স কোন ব্যাপার না। আমার বাসায় সবাই মেনে নিবে। আমরা মাঝে মাঝে ঘুরতে যেতাম। নান্দুজ এ খেতে যেতাম। রিক্সায় ঘন হয়ে বসতাম। একদিন উনি আমাকে বাসায় নিয়ে গেল।

……। এইটুকু বলেই আশিক চুপ হয়ে গেল। আমরা তখন আগ্রহ নিয়ে বসে আছি কিছু রিয়েল লাইফ ইরোটিক স্টোরি শুনতে পারব। আজকাল তো আর rmg পড়া হয় না। এরপর কি হইসে বল।

আশিকঃ ভাই, আমাকে রেপ করসে।

হাহাহাহা…আমরা সবাই রেলিং থেকে নীচে পরে গেলাম। রিয়াদের ঠোঁট থেকে সিগারেট পরে গেল খালের পানিতে।

আশিকঃ নেন ভাই মজা নেন। কেমন লাগসে সেটা শুধু আমিই বুঝি। এত ভয় পাইসিলাম যে কি বলব? কয়েকদিন ঘুমাইতে পারতাম না। খাওয়া দাওয়া ছেড়ে দিসিলাম, কারো সাথে কথা বলতাম না।শামুকের মত নিজেকে গুটায় নিসিলাম। উনার ফোন রিসিভ করতাম না। ভয় লাগত… ভয়ংকর ভালোবাসা।

 

এরপর আমার জীবনে আসে হৃদিতা।

 

শিট। এটাই বাকি ছিল।

 

কেন ভাই? কি হইল?

 

কিছু না। এতক্ষন আমি ভাবতে ছিলাম হৃদি বা হৃদিতা নামের কেউ এন্ট্রি মারল না কেন? এমন গল্পে শতকরা ৫০ ভাগ নায়িকার নাম হৃদি/হৃদিতা থাকে।

[এই স্ট্যাটিসটিকস সম্পূর্ন আমার নিজের শোনা কিছু সত্যি গল্পের আলোকে তৈরী। বাস্তবতার সাথে এর মিল খুঁজতে যাওয়া বোকামি। বিশেষ করে একা'র প্রেমিকার নাম ও যেখানে হৃদি]।

যাক খুশি লাগছে হৃদিতার এন্ট্রি দেখে। ক্যারি অন বয়…পরিচয় হল কিভাবে?

 

বাপের কাছে পড়তে আসত।

 

ওরে খাইসে। তারপর?

 

মাঝে মাঝেই চোখাচোখি হত। এরপর হঠাত্‍ একদিন আননোন নাম্বার থেকে একটা মেয়ে ফোন করে। আপনি খুব ভাল, হ্যান্ডসাম, আপনার অনেক কথা আমি জানি…হ্যান ত্যান। প্রায়ই এভাবে ফোন দিয়ে গ্যাজাতো।

তার কিছুদিন পর জানতে পারলাম ফোনের মেয়েটা আসলে সেই। আব্বুর মোবাইল থেকে আমার নাম্বর নিয়েছিল।

 

বাব্বা চরম ডেসপারেট মেয়ে দেখা যাচ্ছে। দেখতে কেমন ছিল?

 

ভাই আর বইলেন না। একদম ফুটফুটে পরীর মত। ওকে দেখলেই আদর করতে ইচ্ছা করত। হাসলেই গালে একটা গভীর টোল পরত, ভাই পুরা মাথা নষ্ট।

তার কিছুদিন পর ফার্স্ট ডেটিং এ যাই।চলন্ত রিকশায় খুব সাহস করে ওর একটা হাত ধরে প্রপোজ করি…

 

হৃদি কি বলল?

 

লাজুক হাসি দিয়ে বলে, আমি তো  তোমারই।

আমার বাসাতেই বেশীর ভাগ সময় ডেটিং করতাম। বাইরে যাওয়ার তেমন দরকার পরত না।

 

বাসায় ডেটিং করতি মানে কি?

 

আব্বুর কাছে পড়ত আসত না? ওদের ব্যাচ শুরু হত বিকাল ৪টায়। ও অনেক আগে আগেই চলে আসত। তখন আমরা….

 

তখন তোরা কি করতি? স্যার কই থাকত?

 

আপনাদের স্যার তখন নাক ডাকত।

 

তোর বাপ একটা মাল, জন্ম ও দিল একটা মাল রে। তারপর..

 

এমনই একদিন বৃষ্টির দুপুরে ও আগেই বাসায় চলে আসে। ও সোফায় বসে ছিল। আব্বু তখন পাশের ঘরে ঘুমাচ্ছে। বৃষ্টির ছাটে ও হালকা ভিজে গিয়েছিল। ও কে দেখেই আমার মাথা গরম হয়ে গেল।খুব ধীরে ওর ডান হাত টা আমার হাতে নিলাম। আস্তে করে ঠোঁট ছোঁয়ালাম। তারপর পাগলের মত চুমু দিতে দিতে তাকে সোফায় শুইয়ে দিলাম। ও আবেশে শক্ত করে আমাকে জাপটে ধরে ছিল।

 

ভাই থাম থাম। তোর এই গল্প লিখতে গেলে তো চটি হয়ে যাবে। আমার ১৮- পাঠক ও আছে।

 

নারে ভাই তেমন কিছুই করি নাই।

 

সোফায় শোয়ায় ফেললি, আবার কথা বলস।

 

কি এমন করলাম বলেন? শুধু লিপ কিস করেছিলাম আর ওর ঘাড়ে মুখ গুঁজে ছিলাম। এই তো।

 

আচ্ছা বুঝছি, এখন সামনে বাড়।

 

মাঝে মাঝেই ও আমাকে গিফট দিত। আসার সময় সিড়িতে গিফট টা রেখে আমাকে কর দিত। আমি সেটা কালেক্ট করে নিতাম।

এভাবেই চলল কয়েকদিন। হঠাত্‍ করে ওর ব্যবহার কেমন যেন পাল্টে যেতে লাগল।সেক্সের ব্যপারে ও অনেক এগ্রেসিভ হয়ে গেল। সেই সময়ে হৃদির বাসায় কি একটা প্রবলেম চলছিল। হঠাত্‍ একদিন কল দিয়ে বলে আশিক তুমি আমাকে কতটুকু ভালবাসো সেটার প্রমান দিতে হবে ? আমি সব ছেড়ে তোমার বাসায় চলে আসছি।

আমি একদম বাকরুদ্ধ হয়ে গেলাম। মেয়ে বলে কি? ওকে অনেক বুঝানোর চেষ্টা করলাম।

দেখো আমরা এখন অনেক ছোট। পড়ালেখা ও শেষ হয়নি। মাথা গরম কর না। একটু ঠান্ডা মাথায় ভাব। কি হয়েছে খুলে বল আমাকে।

ঠিক আছে তোমার বাসায় না জায়গা হলে আমাকে নিয়ে পালিয়ে যাও। আমি আর সহ্য করতে পারছি না। প্লিজ…

ওকে অনেক কষ্ট করে বুঝিয়ে সেদিন ওর বাসায় দিয়ে আসছিলাম।সেদিন থেকে তার সাথে আমার যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। কল দিলে কল ধরত না। একদিন মোবাইল ই বন্ধ হয়ে গেল। আমি পাগলের মত হয়ে গিয়েছিলাম। তার কিছুদিন পর ওর এক বান্ধবীর কাছ থেকে শুনি হৃদি কোন এক মোটর মেকানিকের সাথে বাসা ছেড়ে পালিয়ে গেছে।

ভাই এটা শুনে আমি পুরা থ। কি বলব কি করব কিছু বুঝতে পারছিলাম না। অজানা রকমের এক কষ্ট বুকে চেপে বসে ছিল। কয়েকদিন কিছুই খেতে পারিনি। ওর কথা মনে পড়লেই খুব কষ্ট হত। ও কেন আমার সাথে এমন করল ভাই আপনারাই বলেন?

আমি কি এতই খারাপ ছিলাম।

তুই খারাপ ছিলা না চান্দু। তোমার দোষ তুমি বাঘের সামনে নর মাংস নিয়া তু তু করছো। ওরে খাইতে দাও নাই। শেষ পর্যন্ত মোটর ম্যাকানিক। হাহাহাহাহাহা…আর হাসতে পারতেসি না হাহাহাহা।

হাসেন হাসেন। মানুষের কষ্ট নিয়া তো হাসবেনই।

তুই মন খারাপ করিস না আশিক, চালায়া যা। তোর কাহিনী শেষ হয় নাই?

না ভাই আর একটু বাকী আছে।

তাড়াতাড়ি শেষ কর। রাত বার টা বাজল প্রায়। এরপর তো নিজের বাড়িতে চোরের মত ঢোকা লাগবে।

 

হৃদিকে ভুলতে আমি ভার্চুয়াল লাইফে খুব একটিভ হয়ে পড়ি। সারাদিন রাত ফেসবুক ইয়াহু হটমেইল এ পড়ে থাকতাম। তখন আমার অনেক ফ্রেন্ড হয়ে যায়। ডিজিটাল যুগের কল্যানে আমার জীবনে আসে ফারিয়াল আসিফ।

ফারিয়াল …হাহাহাহা। শিট শিট শিট। আমাদের সাথে পড়ত একটা মেয়ের নাম ফারিয়াল। আমাদের স্কুল জীবনের ত্রাস। দজ্জাল বেটি।

একে পাইলি কিভাবে?

ভাই রেন্ডমলি এড করেছিলাম।

তুই ফেসবুকে মেয়েদের রেন্ডম এড পাঠাস?

যার প্রো পিক দেখলে মনে ঘন্টি বাঁজে তাদের পাঠাই।

শালার…..আমার ফ্রেন্ডের মধ্যে কাউকে যদি এড করসোস…তোর খবর ই আছে। এখন শেষ কর…।

ও পাকিস্তানি মেয়ে। ছোটবেলা থেকেই জামার্নিতে স্যাটেলড। প্রথম প্রথম টুকটাক চ্যাট করতাম। এরপর কবে যে নেশার মত হয়ে গেল বুঝতেই পারলাম না। দুজনের মধ্যেই একটা কিছু হচ্ছিল। আমরা একজন আরেকজনের উপর নির্ভরশীল হয়ে পরলাম। ও আমাকে প্রতিদিন কল করত। খেয়েছি কিনা, দিন কেমন গেল এসব খবর নিতে ঘন ঘন টেক্সট করত। আমার প্রতি ওর কেয়ার দেখে আস্তে আস্তে আমিও ওর প্রতি দূর্বল হয়ে গেলাম। ওকে ছাড়া কিছুই ভালো লাগত না। আমার পড়ালেখা লাটে উঠে গেল। কিভাবে জামার্নি যাব তখন সেই চিন্তা মাথায়। জার্মান ভাষা শিখতে কোর্সে ভর্তি হলাম। দিন রাত তখন ওদের ভাষা শিখতাম। ফারিয়াল ও অনেক হেল্প করত। উত্‍সাহ দিত। তাড়াতাড়ি চলে আসতে বলত। জার্মানিতে গিয়ে কি করব, ফারিয়ালকে প্রথম যেদিন দেখব তখন কি করব, কিভাবে তার সাথে আগামী দিনগুলো কাটাবো জেগে জেগেই স্বপ্ন দেখতাম। আমাদের প্রেম ছিল নির্মল ও পবিত্র।

বাচ্চা-কাচ্চার নাম ঠিক করোস নাই? নির্মল আর পবিত্র প্রেম যারা করে তারা সবার আগে বাচ্চার নাম ঠিক করে।

নারে ভাই।

আচ্ছা শেষ কর।

এভাবেই ফারিয়ালের সাথে স্বপ্নের মত সময় গুলো কেটে যাচ্ছিলো। পাক্কা তিন বছর আমরা প্রেম করি। আমার কোর্স ও তখন শেষের দিকে। বন ইউনিতে ভর্তির ব্যবস্থা ও ঠিকঠাক। কয়েক মাস পরেই আমি যাচ্ছি আমার স্বপ্নের কাছে। ঠিক তেমন সময় ফেসবুকে ও একটা মেসেজ দিয়ে বলে- আমাদের মধ্যে কোন কিছু সম্ভব না। আমাকে ভুলে যাও। আমি একাউন্ট ডিএকটিভেট করে দিচ্ছি। আমার সাথে কনট্যাক্ট করার কোন ধরনের চেষ্টা করো না।

ব্যাস এখানেই আমার জীবন শেষ। মুহুর্তেই আমার চারপাশ অন্ধকার হয়ে গেল। সব স্বপ্ন ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল।

ফারিয়াল আমার জীবন থেকে চলে যাবার পর আমি উপলব্ধি করি এটাই আসলে আমার ট্রু লাভ ছিল। বাকি গুলো ভুংভাং ছিল। এটাই আমার ফার্স্ট এন্ড লাস্ট ট্রু লাভ একই সাথে এটাই আমার ফার্স্ট এন্ড লাস্ট ট্রু ছ্যাকা। ভাই ফারিয়ালকে আমি অসম্ভব ভালোবাসতাম। ও কেন আমার সাথে এমন করল?

অসম্ভব ভালোবাসতি দেখেই তোরে মূলা ধরায় দিল। সম্ভব ভালোবাসলে ওকে পাওয়া টাও সম্ভব হত।

[ফারিয়ালের এই গল্পটায় লেখকের খানিকটা ভূমিকা আছে। ফারিয়ালের শেষ মেসেজ টা আসার প্রায় মাস দুয়েক আগে লেখকের সাথে আশিকের দেখা হয়েছিল। তখন কথায় কথায় লেখক একটি ভবিষ্যতবানী করেন এভাবে- এত ফাল পারতাসোস কেন রে? তোর ভাগ্যে জার্মানি লেখা নাই। জার্মান মাইয়া ও লেখা নাই। আর কয়েকদিনের মধ্যেই তুই চরম রকমের একটা ছ্যাকা খাবি। ফারিয়ালেয় ফ ও পাবি না। আমি বলে দিলাম। আজকের দিন তারিখ দিয়ে খাতায় লিখে রাখ। বড় ভাইয়ের কথা শুন। এখনো সময় আছে ভালো হয়ে যা। লেখাপড়া কর। জার্মানি যাওয়ার ভূত নামা মাথা থেকে।

তার কয়েকদিন পর লেখক ফারিয়ালের সাথে আশিকের ট্রু ব্রেক আপের কথা শুনে অনেক ব্যাথিত হন]

 

……

মানুষের জীবন এভাবে কেটে যায়। কখনো সুখ আবার কখনো দুঃখ। জীবন কারো জন্যই থেমে থাকে না। জীবনের স্রোত তার নিজ গতিতে বহমান থাকে।

 

এই তো কালকেই ওর সাথে আবার দেখা। চোখে মুখে আবার সেই চকচকে ভাব। নিশ্চিত শালা আবার প্রেমে পড়েছে। খোঁজ নিয়ে জানতে পারলাম আসলেই তাই। নারায়নগঞ্জ থেকে ঢাকা যাওয়ার পথে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক তরুনীর সাথে পরিচয়। ধীরে ধীরে ফ্রেন্ডশিপ….

আমি একটু মুচকি হাসলাম। আশিক ম্লান হেসে বলে, জীবনে ভাই একজনকেই ভালবাসছি। আমার পক্ষে কোন মেয়েকে আর প্রেম করা সম্ভব না। আমি কিছুতেই ফারিয়ালকে আমার জীবন থেকে মুছে ফেলতে পারব না।

তাই এর সাথে কি? একে কেন কষ্ট দিবি?

ভাই ওকে আমার সব কথা বলে দিসি। ওর মনে খুব দুঃখ। আমি শুধু সার্পোট দিয়ে যাচ্ছি। ও প্রানপন চেষ্টা করছে আমার মনকে ভুলানোর। আমি সব বুঝতে পারি। কিন্তু মন থেকে সেই টান টা আর আসে না। মন খারাপ করে চলে গেল হেঁটে হেঁটে….

 

[দুমার উপদেশ বানীঃ আশিক তুমি আর একটা ভুল করে যাচ্ছো। এবার তুমি আরো বড় ধরনের কষ্ট পাবা। একে বলা হয় রিবাউন্ড (Rebound) ছ্যাকা। তুমি একদিন একে ছ্যাকা দিবা। কিন্তু ছ্যাকা টা বুমেরাং এর মত আবার তোমার কাছেই ফেরত আসবে। তখন অনেক কষ্ট পাবা তুমি। লিখে রাখ আমার কথা। মেয়েটাকে কষ্ট দিস না। এখনো টাইম আসে]

 

 

 

 

[ডিসক্লেইমারঃ ঘটনা পুরাই সত্য, হাল্কার উপর ঝাপসা মডিফায়েড। গল্পের পুরুষ চরিত্রগুলোর নাম কাল্পনিক, নিজের সুবিধার্থে কাছের কয়েকজনের নাম ব্যবহার করা। ভাষা স্বাভাবিক কারনেই বেশ সংযত করে লিখা হয়েছে। অনেক গালিগালাজ ও কথপোকথন অহেতুক অশ্লীল মনে হওয়ায় আর লিখি নাই, যার যার রুচি অনুযায়ী জায়গা মত আপনারা বসিয়ে নিবেন এতটুকু আমার বিশ্বাস আছে ]

 


“নিঃস্বার্থ হওয়া টাই সবচাইতে বড় স্বার্থপরতা”

“নিঃস্বার্থ হওয়া টাই সবচাইতে বড় স্বার্থপরতা”

 

জনসম্মুখে এই বিতর্কিত উক্তি করার জন্য একটি পোক্ত ব্যাখ্যা দেবার প্রয়োজন রয়েছে। কঠিন কঠিন বাক্যে প্রবেশ করার আগে কয়েকটি শব্দার্থ আবার ঝালাই করে নেই। সহজে বুঝার জন্য বাংলা একাডেমির ছোটদের অভিধান থেকেই শব্দের অর্থ গুলো টুকে নিলামঃ

 

স্বার্থ- নিজ (আপন); আর একটু খুলে বললে নিজের সুবিধা বা লাভ।

নিঃস্বার্থ- অন্যের জন্য নিজের সুবিধা বা লাভের চিন্তা ত্যাগ।

স্বার্থপরতা- অন্যের ভাল-মন্দের কথা চিন্তা না করে শুধু নিজের লাভ বা সুবিধার কথা চিন্তা করার মনোভাব।

 

এখন চলে আসি উক্তিটির মূলভাবেঃ

 

ভাবসম্প্রসারন করার আগে বুঝে নেই উক্তিটি বিতর্কিত হল কেন? কারন টা আর কিছুই না, হিউম্যান পারসেপশন (দৃষ্টিভঙ্গি)। সহজ ভাষায় বললে আভিধানিক অর্থ দিয়ে শব্দকে বিচার করা। স্বার্থপর শব্দটা আমাদের কানে আসলেই আমাদের মস্তিস্কে একটা নেগেটিভ পারসেপশন তৈরী হয়ে যায়। শব্দটা চোখে পড়লে বা কানে প্রবেশ করলেই আমরা ধরেই নিই এটা খুব খারাপ। আর যে মানুষের চরিত্রে “স্বার্থপর” শব্দটা ট্যাগ করা থাকে সে তো দূর্জন, পরিত্যাজ্য, অমানবিক, খুব খারাপ আর নীচু শ্রেনীর একজন মানুষ। অপরদিকে নিঃস্বার্থ শব্দ টার চারিদিকে সর্বদা স্বর্গীয় পবিত্রতা বিরাজ করে- এটাও দৃষ্টিভঙ্গির খেলা। এখানে আসলে দোষের কিছু নেই। মানবিকতা মানবের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট। এটাই মানব ধর্ম। মানবিক ধর্মে সর্বদাই নিজের উপরে অন্য মানব কে স্থান দেয়া হয়েছে। তাই স্বার্থ শব্দটি নিয়ে মানবের অমানবিক বা বিরূপ ধারনা থাকাটাই স্বাভাবিক।

 

এটা নিয়ে বিতর্ক হত না যদি আমরা আভিধানিক অর্থকে আকঁড়ে না ধরতাম; ভাবার্থ বলে যে আর এক ধরনের অর্থ আছে সেটা ভুলে না যেতাম।

কিন্তু বিতর্ক হতেই হবে, কারন আমরা ভন্ড। ভন্ডামিটুকু তো করতেই হবে। এখানে দোষ কিন্তু শব্দার্থের নয়, ভুল আমাদের চিন্তার সংকীর্নতার। আমরা আমাদের সংকীর্ন ধারনার বাইরে উঁকি দিতে লজ্জা পাই, পাছে লোকে কিছু বলে।

 

এইবার বিষয়বস্তুতে একটু নজর দেয়া যাক।

মানুষের নিঃস্বার্থ হবার পিছনেও স্বার্থ (নিজের সুবিধা বা লাভ) কাজ করে। যেই মানুষ নিঃস্বার্থপর সে মানবকূলে শ্রেষ্ঠ, এতে সন্দেহের কোনই অবকাশ নেই। মানুষের মত মানুষ হবার জন্য নিঃস্বার্থপর হওয়া  অপরিহার্য গুনাবলী গুলোর একটি। এই শব্দ নিয়ে কারো কোন সমস্যা নেই। এটি খুব ভালো শব্দ, ভদ্র শব্দ, পবিত্র শব্দ- সর্বোপরি মানবিক শব্দ। কিন্তু যখনই বললাম নিঃস্বার্থপর হওয়া টাই সবচাইতে বড় স্বার্থপরতা- সবাই উক্তিটিকে নেগেটিভলি নিয়ে নিল। একটি মানবিক শব্দের সাথে অমানবিক শব্দের যোগসূত্র অনেকেই মেনে নিতে পারল না। তাহলে কি আমার ভুল হয়ে গেল? মোটেও না…

এবার একটু ম্যাক্রো লেভেলে গিয়ে বিশ্লেষন করা যাক। নিঃস্বার্থ শব্দ টি আমরা কোথায় কোথায় আর কোন কোন পরিস্থিতিতে ব্যাবহার করি?

 

- নিঃস্বার্থ সাহায্য/দান/খয়রাত/সম্প্রদান…

 

এগুলার অনেক অনেক রুপ আছে। গুরুত্বপূর্ন কয়েকটি বিষয় আলোচনা করছি।

এই শব্দ গুলোর সাথে ধর্মীয় ব্যাপার টা ওতপ্রোতভাবে জরিত। চাইলেও আলোচনার বাইরে রাখা যাবে না।

 

নিঃস্বার্থভাবে কি আমরা কেউ দান করতে পারি? পাঁচ টাকা কাউকে দেবার সময় কতটা তাকে সাহায্য করার অভিপ্রায়ে আর কতটাই বা পাপস্খলনের অথবা পুন্য লাভের আশায় দান করি? এটাকি স্বার্থ না? পূন্য চাওয়া টা কি খারাপ?

 

সমাজসেবার করতে আজকাল আমাদের ব্যানার লাগে। তা না হলে তো নাম হবে না। সমাজ সেবায় এপ্রিসিয়েশন ইজ মাস্ট। মানুষ জানবে আমি হেন করছি তেন করছি। চারিদিকে আমার নাম ছড়াবে। তবেই না এটা সেবা। পেপারে ছবি আসবে, টিভিতে ফুটেজ তবেই না আমার স্বার্থ হাসিল হবে। এখন এটা যদি আমার স্বার্থ না হয় তাহলে তো খেলব না। গালি দাও আর যাই কর, নামের বিনিময়ে সেবা কিন্তু আমি ঠিক-ই করছি। এটা কি খারাপ?

 

…এক বন্ধু আরেক বন্ধুকে বলছে, ঐ ব্যাটারে এত সাহায্য করলাম, একটা ধন্যবাদ পর্যন্ত দিল না। শালা নিমকহারাম। এই ধন্যবাদ চাওয়া টা কি স্বার্থ না?

হ্যা, অনেকেই এসব নাম ডাকের পরোয়া করেন না। তারা আসলেই মানব সেবা করে যান অনেক টা নিঃভৃতে আড়ালে। কেউ জানতেও পারে না। এমন কি যাকে সাহায্য করল সেও জানে না কে তাকে সাহায্য করল। এই ক্ষেত্রে কাজ করে সেলফ স্যাটিস্ফেকশন। সেলফ এপ্রিশিয়েশন। এটাও স্বার্থ। কাউকে উপকার করে আমার যে ভালো লাগা টা, এই যে প্রশান্তি এটাই আমার স্বার্থ।

এখন প্রশ্ন করি এই স্বার্থ থাকা কি খারাপ???

 

-নিঃস্বার্থ ভালোবাসা

 

আসলেই কি নিঃস্বার্থভাবে ভালোবাসা সম্ভব? নিঃস্বার্থ শব্দ টি যে জ্ঞানী ব্যাক্তি আবিষ্কার করেছেন তার প্রতি শ্রধ্যা রেখেই বলছি- সম্ভব নয়।

তর্কবাগীশরা নিশ্চয়ই খুশি হয়ে গেছেন? এইবার প্রশ্ন করবেন, তাহলে চান্দু সন্তানের প্রতি ‘মা’ এর ভালোবাসা কি নিঃস্বার্থ নয়?

অবশ্যই নয়? সন্তানের প্রতি মায়ের স্নেহ-ভালোবাসা-মমতা নিঃস্বার্থ হতেই পারে না। সব মা তাদের সন্তানের মঙ্গল কামনা করেন। তার সন্তান যেন সুখে শান্তিতে থাকে সেইভাবেই তাকে লালন করেন। প্রসবের পর সন্তানের সুখের সামনে সবকিছু তার কাছে মূল্যহীন হয়ে যায়। মা তার সন্তানের জন্য কি কি করে সেসব বলে লেখা বড় করব না, কারন লিখে শেষ করা যাবে না। কিন্তু যাই করে তা কি নিঃস্বার্থ ভাবে করে? এখানে কি তার কোনই স্বার্থ থাকেনা? বিনিময়ে কি মা কিছুই চায় না? মা কি চান না তার সন্তান বাধ্য হোক? সন্তানকে নিয়ে মা যে স্বপ্ন দেখেছেন তা পূরন করুক? তার সন্তান ভদ্র হোক, নম্র হোক, একজন মানুষের মত মানুষ হোক এটা কি তিনি চান না?

আমরা যখন মায়ের অবাধ্য হই, তার চোখে কোন খারাপ কাজ করি তাহলে কেন তিনি কষ্ট পান? কষ্ট পান কারন তার স্বার্থে আমরা আঘাত করি। তার ভালোবাসাকে অমর্যাদা করি। সন্তানের ভালো চাওয়া টাই এখানে ‘মা’ এর স্বার্থ।

তর্কের খাতিরে না হয় মেনেই নিলাম, মা তার ভালোবাসার জন্য কখনোই বিনিময়ে কিছুর প্রত্যাশা করেন না। কিন্তু ভুলে গেলে চলবে না, নাড়ীর টান বলে একটা টার্ম আছে। জগতের প্রতিটি সন্তান তার মায়ের একটি অংশ। মেটাফোরিক্যালি সন্তান ভালো থাকলে মা ভালো থাকে। আর কিছু না হোক, সন্তানের ভালো থাকায় প্রতিটি মা মানসিক প্রশান্তি লাভ করেন। এখন যদি এই প্রশান্তি লাভ কে আপনি তার স্বার্থ হিসেবে মেনে না নেন তাহলে আপনি বোকা।

 

একই কথা বাবা ভাই বোন পরিবার বন্ধু-বান্ধববের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।

 

এখন প্রশ্ন করি, এই স্বার্থ থাকা টা কি খারাপ?

 

নিঃস্বার্থ প্রেম বলেও একটা কথা প্রচলিত আছে। কেউ এর সঠিক মানে জানুক আর না জানুক কিন্তু এই টার্ম টা উচ্চারন করতে আমরা কম বেশী সবাই খুব পছন্দ করি। কোন ব্যাখ্যায় যাব না। ছোট একটা গল্প বলব।

আমার এক বন্ধু হঠাৎ করেই জানতে পারল তার ফুসফুসে ক্যান্সারের জীবানু বাসা বেঁধেছে। একদম টারসিয়ারী স্টেজে ধরা পরেছে। বেশীদিন আর বাঁচবে না। আমার এক বান্ধবীর সাথেই সে ছয় বছর ধরে প্রেম করত। তারা ছিল আমার দেখা সবচেয়ে পারফেক্ট জুটি। যাকে বলে একদম মেইড ফর ইচ আদার। একবছর পরই তাদের বিয়ে করার কথা ছিল। এর মধ্যেই বন্ধুর রিপোর্ট চলে আসল। আমরা কেউ ই কিছু জানতাম না। হঠাৎ করেই বন্ধুর ব্যবহার কেমন যেন হয়ে গেল। তার প্রেমিকাকে শুধু শুধু সন্দেহ করা শুরু করল। কোন ছেলের সাথে কথা বললেই উলটা পালটা কথা বলে রাগারাগি করত। এমন কি আমাদের সাথে কথা বললেও রেহাই ছিল না। শুধু তাই না, অন্য একটা মেয়ের সাথে সে ঘুরাঘুরি করা শুরু করল। এমন করেই একদিন তাদের সম্পর্ক ভেঙে গেল। তার কয়েক মাস পর বান্ধবীর বিয়ে হয়ে যায়। ঠিক এক বছর পর বন্ধু মারা যায়। তার মারা যাবার কয়েকদিন পর থাইল্যান্ড থেকে একটা চিঠি পাই।

“আমি মরে যাচ্ছি দোস্ত। ………কে কিছু জানতে দিস না। ওর খোঁজ খবর নিস। ও যেন ভালো থাকে। … আমাকে মাফ করে দিস ” ।

 

আমার বন্ধু চেয়েছিল নিঃস্বার্থভাবে ভালোবাসতে। ওর প্রেমিকা যেন ভালো থাকে, তার জীবন যেন নষ্ট না হয়। তাই এত নাটক, এত অভিনয়। প্রেমিকা যেন পরে খুব কষ্ট না পায় তাই সে এমন করল। এইক্ষেত্রে প্রেমিকা কি চাইত সে তা বুঝার ও চেষ্টা করেনি। নিঃস্বার্থভাবেই সে তাকে ছেড়ে চলে গেছে। আসলেই কি এখানে আমার বন্ধুর কোন স্বার্থ ছিল না? অবশ্যই ছিল। তার ভালোবাসাটাই এখানে তার স্বার্থ। আবারো মানসিক প্রশান্তি…

 

এটা মূদ্রার একপিঠ গেল। অপর পিঠের চিত্র আরো মজার। এখানে এই ধরনের স্যাক্রিফাইস করার বিনিময়ে অনেকেই আবার এপ্রিসিয়েশন চেয়ে বসে। চারপাশ থেকে আসা এপ্রিসিয়েশনে বুক ফুলে যায়। নিজেকে মহৎ ভাবা যায়।

আর কিছু যদি না-ই চায় তবুও সেলফ এপ্রিসিয়েশন তো আছেই। এটা নিয়েই কিছু মানুষ সন্তুষ্ট থাকে। এখন কেউ যদি বলে আমি সেলফ এপ্রিশিয়েশন করি না তাহলে আপনি একজন ভন্ড…।

 

প্রশ্ন একটাই, স্বার্থ মানেই কি খারাপ? স্বার্থের বিচার করা উচিৎ পরিস্থিতি মোতাবেক, সামগ্রিকভাবে। আমাদের সংকীর্ন চিন্তার গন্ডি পেরিয়ে একটু বিশাল পরিসরে ভাবতে দোষ কি? শব্দের অর্থ নিয়ে ভালো মন্দের বিচার হয় না।

নিঃস্বার্থপর হবার পিছনেও স্বার্থপরতা থাকে। এতে তো দোষের কিছু নাই। তাহলে আমরা নেগেটিভলি কেন নিচ্ছি? কারো যদি ত্যাগ করে প্রশান্তি না-ই লাগত তাহলে কি আর সে নিঃস্বার্থ হত? এইক্ষেত্রে স্বার্থপর হলে কি কারো কোন ক্ষতি হয়? হয় না। এসব ক্ষেত্রে নিঃস্বার্থ আর স্বার্থ শব্দ দুটির পারস্পরিক সম্পর্ক আর ভাবার্থ কিন্তু ঠিক-ই থাকে। এইসব নিঃপাপ স্বার্থের জন্য নিশ্চয়ই আপনি নিঃশ্বার্থ শব্দটকে বাদ দেবেন না। উক্তিটি কোন দিক থেকেই নেগেটিভ ছিল না। কিন্তু আমরা এটাকে নেগেটিভ নিয়েছি। সব দোষ আমাদের সংকীর্ন দৃষ্টিভঙ্গির।

 

আসুন আমরা উদার হই, নিঃস্বার্পর হই, সর্বোপরি স্বার্থপর হই।

 


গরম পানি (ছোট গল্প)


এক শীতের সন্ধ্যায় চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে জীবনের বর্নিল সময় গুলোর গল্প বলছিল আমাদের আব্দুল্লাহ ভাই। এইবার একটা প্রেমের গল্প হোক আব্দুল্লাহ ভাই,  খুব দরদ দিয়ে দীপ অনুরোধ করতেই পটেনশিয়াল প্রেমিকা নম্বর এক্স এর গল্প শুরু হয়ে গেল। ‘মেয়ে’ প্রসংগ উঠতেই যথারীতি আব্দুল্লাহ ভাইয়ের চেহারায় তখন হাজার ওয়াট এলইডি ল্যাম্পের ঝিলিক। অমায়িক হাসি যেন থামতেই চায় না। হাসির ঠ্যালায় চোখ দুটো পুরা চাইনিজ প্রডাক্ট। আবেগী গল্পে তখন টান টান উত্তেজনা। এখনি নায়ক-নায়িকার সম্মেলন হয়ে যাবে হয়ে যাবে একটা ভাব। আমরা সবাই মোহবিষ্ট হয়ে ঘটনা গাম্ভীর্যতা ফ্যান্টাসাইজ করে আহা উহু করছি। ক্লাইম্যাক্সের  ঠিক মাহেন্দ্রক্ষনে বেরসিক ইমন আব্দুল্লাহ ভাইকে দিল এক ধাক্কা। আব্দুল্লাহ ভাই কক শব্দ করে ছিটকে পরল রাস্তার একদিকে, চায়ের কাপ আরেকদিকে।  চায়ের রঙের ঘন ঘন মৌসুমী (কন্ডেস্নড মিল্ক) তখন তার সারা গায়ে মাখামাখি।

সুরেলা স্বরে আবদুল্লাহ ভাই বলল – দিলি তো শীতের রাইতে একটা পুঁটুঁ মাইরা? পুরাডা শরীর এখন চ্যাট চ্যাট করব।

সরি ভাই। একদম খেয়াল করি নাই। দাঁড়ান পানি আইনা দেই। ধুইয়া ফালান- বলে ভয়ে ভয়ে ইমন দৌড় দিল।

-      অই ইমন গরম পানি লইয়া আহিস, চিৎকার দিল আব্দুল্লাহ ভাই।

দোকান থেকে ইমন এক মগ পানি নিয়ে আসলো। আব্দুল্লাহ ভাই সোয়েটার টা খুলে রাস্তার সাইডে চলে গেল হাত ধুতে। আমরা শুধু একটা আর্তনাদ শুনলাম। তারপর যথারীতি আব্দুল্লাহ ভাইয়ের দাবড়ানী-

-      ঐ ইমন…তোরে গরম পানি আনতে কইসিলাম না? (চিৎকার করে)

-      গরম পানি পামু কই? চুলা আজকে বন্ধ দেখতাসেন না?

-      আয় শালা…মুইতা দে হাতের উপরে। মুত দিয়া হাত ধুই- বিরক্ত হয়ে বলল আব্দুল্লাহ ভাই।

এটা শুনে আমরা কেউ ই হাসি আটকায়ে রাখতে পারলাম না। আমাদের হাসি আর টিটকারী শুনে আব্দুল্লাহ ভাই মনে হয় কিছুটা অসন্তুষ্ট হয়েই বললেন- বুঝবেন বুঝবেন। ঠ্যাকায় পরলে মুত দিয়াই হাত-পা ধোয়া লাগবে। আপনাদের একটা গল্প বলি শুনেন-

আপনারা তো জানেনই, এককালে আমি পর্বতারোহী ছিলাম।

-      এখন আর নাই? কথার মাঝে আমি ফোঁড়ন কাটলাম।

-      হায়রে,দুক্ষের কথা আপনাদের আর কি বলি বলেন। যেটায় আরোহন করতে চাই…সেটা তো আর পাই না রে ভাই। বলেই দুষ্টুমি মার্কা হাসি উপহার দিয়ে আবার গল্পে চলে গেল আব্দুল্লাহ ভাই।

আমি তখন হিমালায়ান রেঞ্জে প্রায় ৪০০০ মিটার উপরে, ফ্রে পিক এর বেইজ ক্যাম্প এ । এইখানকার ঠান্ডায় ওলা মুরগীর মত সব কাঁপতাসো আর ঐখানে কি অবস্থা শুধু চিন্তা কইরা দেখো। তাও শালার গেসিলাম শীতকালে। একে তো মরন ঠান্ডা তার উপর আবার পানি নাই। এক ফোঁটা পানি গালাইতে যে কি পরিমান কষ্ট হয় সেটা বুঝাইতে পারুম না।

তো ক্যাম্পে এমনই এক চায়ের আড্ডা দিচ্ছিলাম। ফারাহ নামের আমার এক টীম মেট  ইমনের মতি আমাকে একদম মেরে দিল।

-      মেরে দিল????????????? আমরা সবাই চাপা স্বরে জিজ্ঞেস করলাম।

তিনি চোখ টিপে জবাব দিল- একদম পেছন থেকে ;)

-      তারপর??

-      তারপর আর কি। এখন তো হাত একদম চ্যাট চ্যাট করছে। হাই অল্টিটিউড এ এমনিতেই চামড়া খসখসে টানটান থাকে। ফেটে যায়, ব্লিডিং হয়। আর এমন চ্যাটচ্যাটে হয়ে থাকলে এটার রিস্ক আরো বেড়ে যায়। সেইক্ষেত্রে হাত ধোয়া টা সেই মুহুর্তে আরামের চেয়ে বেশী ছিল প্রয়োজন। কিন্তু এখন হাত ধুই কি দিয়া? এখন গরম পানি পাই কই?

আমার এই অসহায় অবস্থা দেখে ফারাহ আবার খুব মজা নিচ্ছে আর প্যারা দিয়ে যাচ্ছে। বারবার আমার কানের সামনে এসে বলছে- যা আব্দুল্লাহ কিচেন টেন্টে যা, গরম পানি দিয়ে হাত ধো।

কিচেন টেন্টের কাহিনীটা বলি, গরম পানির রেসনিং চলতেসে, আগেই তো বলসি। এরই মধ্যে ফারাহ সকালে খুখ ধোয়ার জন্য গরম পানি চাইতে গিয়ে কুকের কাছে অনেক ঝাড়ি খাইসিলো। এটা নিয়ে আমরা আবার ওকে প্যারা দিচ্ছিলাম। এখন ও একটা সুযোগ পাইসে, তাই খুব খুশি।

-      যাই, গরম পানি দিয়ে হাত টা ধুয়েই আসি বলে আর থাকতে না পেরে উঠে গেলাম। মনে মনে চিন্তা করতেসি, এখন যদি মরেও যাই তবুও ওরা দুইবার চিন্তা করবে এক ফোঁটা গরম পানি মুখে দিবে কিনা। আর এই সামান্য হাত ধুতে চাইলে যে কি করবে…। চিন্তাও করতে চাই না।

একটু আড়ালে গিয়ে সোজা ট্রাউজারের জিপার খুলে হোস পাইপ খুলে দিলাম…।

…… উফফফ তখন কি যে আরাম লাগতেসিলো , সেটা তোমাদের ফিল করাতে পারব না।

হাত ধুয়ে ভালো মানুষের মত ওয়েট তিস্যুতে হাত মুছে ফুল বাবুর মত বসে থাকলাম। ফারাহ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, আব্দুল্লাহ তুই কি গরম পানি দিয়ে হাত ধুয়ে আসলি?

-হ্যা।

- যা মিথ্যুক। আমাকেই দিল না গরম পানি। আর তোরে দিবে?

- বিশ্বাস না হলে ধরে দেখ।

বলার পরই ফারাহ হাত বুলায়ে দেখল আসলেই আর চ্যাটচ্যাটে ভাব টা নাই।

মন খারাপ করে ফারাহ বলল- তুই চাইতেই গরম পানি দিয়ে দিল?

-      মোটেই না।

অবাক হয়ে বলে- তাইলে পানি পাইলি কই???

আমি মুচকি হেসে বলি- কেন ??? মানুষ গরম পানি প্রডিউস করতে পারে না? ;)

 

 

 


খাপছাড়া কথা [তিন]

ঘুরে ফিরে আবারো সেই প্রশ্ন, করব কি এই জীবনটা নিয়ে? ছোটবেলায় এই প্রশ্নের উত্তর দেয়াটা বেশ সহজ ছিল।ক্লাস ৮ পর্যন্ত “মাই এইম ইন লাইফ” রচনা টা খুব কমন ছিল বলে পুরা ঠোটের আগায় থাকত। উত্তর টাও বেশ সহজ-সরল ছিল। আমি বড় হয়ে ডাক্তার হতে চাই। ইঞ্জিনিয়ার ও হতে পারতাম,কিন্তু কিছু টেকনিক্যাল টার্মস মুখস্ত করতে কষ্ট হত বিধায় আমি সব সময় ডাক্তার হওয়াটাই পছন্দ করতাম। ডাক্তার হওয়ার কন্সেপ্ট টাও বেশ সহজ, আমি ডাক্তার হয়ে সমাজের গরীব-দুখী-চিকিৎসা সুবিধা বঞ্চিত মানুষের পাশে গিয়ে দাঁড়াব। ব্যাস, কাহিনী এতটুকুই। এর সাথে দু-চার লাইন এড করলেই হয়ে গেল। পাশ করার জন্য এর থেকে বেশী কিছুর দরকার ও নাই।

পিচ্চিকালে খেলনা ভাঙ্গা আমার খুব প্রিয় একটা হবি ছিল (এখনো আছে অবশ্য, কিন্তু কেউ তো আর খেলনা গিফট দেয়না)।ইলেক্ট্রিক গেজেট গুলো কিভাবে কাজ করে, মোটরের গাড়ী কিভাবে চলে, হেলিকপ্টার কিভাবে উড়ে এগুলো ভেঙ্গে দেখতে খুব ভালো লাগত। নতুন গাড়ী ভেঙে মোটর খুলে ফেলতাম। তার সাথে সিগারেটের এলুমিনাম ফয়েল দিয়ে বানানো টারবাইন লাগিয়ে সাব-মেরিন বানাতাম। ভাল একটা টর্চ লাইট ভেঙে নিজের মত করে একটা বানাতাম। আর কত কি যে করতাম [টাইম পাইলে এখনো করি, এই কাজটা আমি অনেক পছন্দ করি]…সব লিখতে বসলে এই পোস্টের বিষয়ই পালটে যাবে। এগুলো হয়ত ইন্ডিকেটর ছিল বড় হয়ে বড় একজন ইঞ্জিনিয়ার হব। কিন্তু কেউ এপ্রিশিয়েট করা দূরে থাক, উলটা মাইর জুটত কপালে। যাই হোক, আমার মতে উপরের এই কাজ গুলো ৯০% বাচ্চাই করে। এটা হয়ত ঐ বয়সের একটা অভ্যাস।

মাঝে কয়েকদিন ক্রিকেট নিয়েও বিজি ছিলাম।

আগের পর্বে লিখেছিলাম, আমাদের জন্মের পরপরই আমাদের আপনজন আমাদের নিয়ে একটি স্বপ্ন দেখে ফেলেন- যেখানে আমাদের চরিত্র থাকলেও কোন ভূমিকা থাকে না। আমিও এর ব্যাতিক্রম নই। আমার জন্ম এমন একটা পরিবারে হয়েছে যেখানে দাদা থেকে শুরু করে বাবা-চাচা এমন কি আমার বোন ও চিকিৎসার সাথে জড়িৎ। পারিবারিক আবহাওয়া এমন থাকায় স্বাভাবিক কারনেই আমার মনে দাগ কাটে। মনে মনে জানতাম এমনই কিছু একটা হতে হবে, করতে হবে আমাকে। তা ছাড়া আমার আব্বাজানের ইমোশনাল আর লিথাল ইনফ্লুয়েন্স তো ছিলই। বুড়ো লোকটাকে দোষ দেয়া টা ঠিক হচ্ছে না। উনার ইনফ্লুয়েন্স করার সিস্টেম টা খুব ইউনিক ছিল।

বই!!!

ছোটবেলা থেকেই উনি যেই কাজ টি করতেন সেটা হল আমাকে বই কিনে দেয়া।দেশ বিদেশের নানা বিষয়ের উপর বই।কিন্তু বাচ্চা দের উপযোগী চিকিৎসা বিজ্ঞানের বইয়ের মাত্রা মনে হয় একটু বেশীই থাকত। একটা বইয়ের কথা এই মুহূর্তে খুব মনে পড়ছে, পেনিসিলিন আবিস্কারের কাহিনী। আর একটি পক্সের জীবানুর পরাজয়… আরো অনেক…। সেই

এগুলো স্লো পয়জন এর মত আমার রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছিড়িয়ে পড়ে নিজের লক্ষ্য ঠিক করে নেয়।

কয়েকদিন আগ পর্যন্ত এই লক্ষ্যেই হাটছিলাম। বড় সায়েন্টিস্ট হব। লিলি/ সিবা গিগি/ সানোফি-এভেন্টিসের মত আন্ডারগ্রাউন্ড হাইটেক রিসার্চ ল্যাবে ক্যান্সার নিয়ে রিসার্চ করব। নবেল পাব…।

দেশের নাম উজ্জ্বল করব।
দেশ…??

মাঝখান থেইকা এই দেশ টা আসলো কই থেইকা? ভাবার মত একটা বিষয়। আমি নোবেল পাইলে আমার দেশের লাভ টা কি? দেশ কি আমার নোবেল ধুইয়া পানি খাইব?? বিদেশের কয়েকটা পেপারে আমার নাগরিকত্ব টা উঠে আসবে, কয়েকদিন বেশ মাতামাতি হবে। দেশে এসে সরকার-বিরোধীদল-আর কিছু চুশীলদের সংবর্ধনা নিয়ে আবার চলে যাব বিদেশে- যেখানে আছে আরাম আর আয়েশ। মাঝখান থেকে এই দেশটা কি পাবে? কিসসু না।পাওয়ার মধ্যে কিছু সস্তা নাম কামায় নিতে পারে। ঐ নাম দিয়ে কি আর ২০-২৫ কোটি মানুষের পেট ভরবে? বাংলাদেশ কি মালয়সিয়া হয়ে যাবে? নাহ, মোটেও না।
তবে একটা ব্যাপার অবশ্য হতে পারে। আমার আবিস্কৃত মলিকিউল টা হয়ত বাংলাদেশে মানুফ্যাকচার করার জন্য কোম্পানী কে চাপ দিতে পারি [এটা নির্ভর করবে কোম্পানীর উপর, ওরা যদি আমাকে আরো ১কোটি ডলার বাড়ায় দিয়ে বলে দেশকে ভুলে যাও, তাইলে আমি দেশকে ভুলে যাব। টাকা বহুত খারাপ চিজ ]। প্ল্যান্ট হইল, কিছু গরীব-দুখী মানুষ সেখানে তাদের সস্তা শ্রম বিক্রি করে ধন্য হয়ে আমার শতায়ুর জন্য দোয়া ও করল। আমিও খুশি- দেশের জন্য কিছু করতে পারলাম ভেবে সব সময় বুক টান টান। কিন্তু বাস্তবতা হল, এরপরেও আমার দেশের অবস্থা পাল্টাবে না। দেশের সিস্টেম পাল্টাবে না। আমরা নিজেদের পাল্টাবো না। এরপরেও সরকারের উপর থেকে নীচ পর্যন্ত দূর্নীতি থাকবে, বিরোধী দল আজাইড়া আন্দোলন করবে,বস্তিতে বস্তিতে নগ্ন-রুগ্ন ছেলেমেয়ে দৌড়ে বেড়াবে,হাত পেতে শীতের/যাকাতের কাপড় নেয়ার সময় পায়ের চাপে পিষ্ট হবে , ডাক্তারেরা রোগী জবাই করবে, ইঞ্জিনিয়ার বিল্ডিং এ সিমেন্ট কম দিবে, শিক্ষক ছাত্রীকে নির্যাতন করবে,ফেবুতে সোসিওলজি প্র্যাক্টিস করব, ব্লগে আমরা আস্তিক-নাস্তিক/ছাগু খেদাও/চুশীল /মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষে/ স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের পক্ষে পোস্ট দিয়ে যাব। কিছুই পাল্টাবে না। আস্তে আস্তে এই দেশ বসবাসের অযোগ্য হয়ে যাবে-একসময় হারিয়ে যাবে তার ঐতিহ্য নিয়ে।

তাই আমার নোবেল পাওয়ায় এই হতভাগ্য দেশ কিছুই পাবে না। আমাকে জন্ম দেয়া, থাকা-খাওয়া-পড়ালেখার ব্যবস্থা করে দেয়া আর গর্ব করার মত একটি ইতিহাস ও ভাষার বিনিময়ে আমি তাকে কিছুই দিতে পারব না।

এটা ঠিক হচ্ছে না। কোথাও কোন গন্ডগোল আছে। মাথায় একটা পোকা টিক টিক করতেসে…এটা ঠিক না, এটা ঠিক হচ্ছে না…

অপেক্ষা করার মত সময় নেই। যা করার তাড়াতাড়ি করতে হবে। জীবন থেমে থাকে না- Life wont wait ……

 


খ্যাপ মারস কে কে…?

 

এটা একটি খ্যাপ মারার কাহিনী। এই যুগে খ্যাপ মারা একটি বহুল প্রচলিত শব্দ। সরকারী ডাক্তার জায়গায় জায়গায় খ্যাপ মেরে বেড়ায়। পাবলিক ইউনিভার্সিটির টিচার রা প্রাইভেটে খ্যাপ মেরে পকেট ভারী করে। খ্যাপ মারা কে আমরা আজকাল ভদ্র ভাষায় ফ্রি লেন্স ও বলে থাকি। যাই হোক, আমার খ্যাপ মারা টা কিন্তু এইসবের মত গুরুতর ছিল না, নিতান্তই নিরীহ টাইপের ছিল। :)

ক্রিকেটের প্রতি ভালোবাসা সেই ছোটবেলা থেকেই। হোস্টেলে থাকার সময় ফুটবল-বাস্কেটবল-ভলিভল-টেবিল টেনিস সারা বছর ধরে যতই খেললাম না কেনো শীতকালে ক্রিকেট মৌসুম শুরু হলেই মনে হত, নাহ এটাই আসল খেলা। এটার জন্যই আমার জন্ম হয়েছে।ক্রিকেট কে এক কথায় ভালোবেসে ফেলেছিলাম, তাই অন্যান্য খেলার চেয়ে ক্রিকেট টাই ভালো খেলতাম।

ক্লাস সিক্সে যখন পড়ি, হঠাৎ মাথায় একটা কেরা উঠল- ফুলটাইম ক্রিকেটার হলেই তো ভাল। লেখাপড়া করার কি দরকার?? শচিন কি লেখাপড়া করসে?? যেই ভাবা সেই কাজ, পরদিনই ভর্তি হয়ে গেলাম দুলু মিয়ার একাডেমিতে। এই একাডেমি অনেক নাম কড়া ক্রিকেটার কে জন্ম দিছে। তাদের নাম আর নিলাম না, তাদের সাথে এক কালে প্র্যাকটিস করসি চিন্তা করলেই একদিকে গর্বিত হই আবার লজ্জাও লাগে। :`>” width=”23″ height=”22″ /> <img src=

ছোটবেলা থেকেই এই ধরনের প্র্যাকটিস আর ড্রিলিং এর সাথে পরিচয় থাকায় খাপ খাইয়ে নিতে খুব একটা সময় লাগে নি। মনে মনে বললাম, যাক সাত সকালে ঘুম থেকে উঠে গাধার মত দৌড়ানি টা এখন কাজে লাগল। মন প্রান ঢেলে দিলাম ক্রিকেট শিখতে। দিন রাত শুধু ক্রিকেট আর ক্রিকেট। মোজার ভিতর বল ঢুকিয়ে, ঘড়ের সিলিং থেকে সেটা ঝুলিয়ে সারারাত খট খট করে পিটাতাম। আমার এই কঠোর পরিশ্রম দেখে কোচ আমার উপর ফিদা হয়ে গেলো। মাত্র ৭দিনের মাথায় নেটে যাওয়ার সুযোগ পেয়ে গেলাম। কম কথা??(এটা ছিল আমার প্রথম ভুল)
পোলাপান যেখানে ২-৩মাস গাধার মত ঘাম ঝরিয়ে ও নেটে ঢুকার চান্স পায় না সেখানে মাত্র ৭ দিন?? পোলাপানের হিংসা তো হবেই। (ঠিক সামু তে সেইফ হবার টাইমের সাথে মিলে যায়। আমার সেইফ হতে ৩ মাস লাগেছিল।এখন যদি কাউকে ৭দিনের মধ্যেই কমেন্ট করতে দেখি তো মডুর গুষ্টি উদ্ধার করে পোস্ট দেই /:) /:) )

আমার দ্বিতীয় ভুল ছিল এক প্র্যাক্টিস ম্যাচে সিনিয়র টিমের বিরুদ্ধে ৩চারের বিনিময়ে ৩৫ রান করা। এই পারফর্মেন্সকে পুঁজি করে স্কুলের নির্মান টিমেও ঢুকে গেলাম। সেই সময় নির্মান এর ম্যাচ গুলো খুব ফাটাফাটি হত। পাশের গার্লস স্কুলের মেয়েরা ও খেলা দেখতে আসত। ;) ;) লোকাল হিরো হবার এটা ছিল পারফেক্ট একটা জায়গা। আমি সেই সময়ের কথা বলছি যখন বাংলাদেশ প্রথম বারের মত আইসিসি ট্রফি জিতে নেয়। তাই সেই সময়ে ক্রিকেট নিয়ে এক অন্য রকমেরই উত্তেজনা থাকত। দিন দিন আমার পারফর্মেন্স বেটার হতে লাগল। ক্লাস সিক্সেই নির্মানে চান্স পেয়ে যাব এমন কানাঘুসা শুনতে পারছিলাম। (সাধারনত সিনিয়র রাই থাকত মূল একাদশে)। টিম ঘোষনার পর নিজের নাম দেখে ব্যাপক খুশি হয়ে আব্বাজানকে জানাই।১মাস পরেই সিজন শুরু হয়ে যাবে…এখন আর ঠেকায় কে।

এমন সময়ের এক বৃঃস্পতিবার বড় ভাইয়া বলল
- আগামী শুক্রবার ফ্রি আসস?
- বিকালে প্র্যাক্টিস আসে। কেন?
- খ্যাপ খেলতে যাবি?
- খ্যাপ কি? :||
- আরে একটা প্ল্যায়ার শর্ট পরসে, তার জায়গায় খেলবি?
- খেলব । (খুশি হয়ে গেলাম। দিনের পর দিন শুধু প্র্যাক্টিস ই করে গেলাম…অনেক দিন কোন ম্যাচ খেলা হয় না।) এটা আমার তৃতীয় ভুল।
- সকালে রেডি থাকিস। কুমিল্লা যাওয়া লাগবে।
এইখানে একটা কথা বলে নেই, আমার চাচাতো ৩ ভাই ই বেশ ভালো ক্রিকেট খেলত। কিন্তু আমার ফ্যামিলি তাদের সেই প্রয়োজনীয় সাপোর্ট দেয় নি। আমিও তখন লুকিয়ে লুকিয়ে ভাইয়াদের সাহায্যেই প্র্যাক্টিস করছিলাম। কিন্তু ক্রিকেট খুব বিলাসিতার খেলা। এটা খেলতে গেলে কিছু জিনিস কিনতে হয়। কমপক্ষে একটি প্রাকটিস ব্যাট, একটি ম্যাচ ব্যাট আর একটি গার্ড না হলে তো খেলাই যাবে না। এত টাকা পাব কই? আব্বাজানকে বললে তো সরাসরি জবাই করে দিবে। তাই আমার ছোট চাচাকে গিয়ে ধরলাম। আমাকে অবাক করে এগুলো কিনেও দিল, সাথে বোনাস হিসেবে একটি হেলমেট ও।(আমি খান্দানের ছোট ছেলে, তাই ভাইয়াদের মানা করলেও আমাকে মানা করে নাই)

ভোরে উঠেই ব্যাগ নিয়ে দুই ভাই বেড়িয়ে গেলাম। আমি ভেবেছিলাম মামুলি টেপ টেনিস ম্যাচ হবে। মাঠে নেমেই মাথার উপর বাজ ভেংগে পরল। আয় হায়…আমার গার্ড আনি নাই :(( :( /:) :|| X( X(( :``>>” width=”23″ height=”22″ /> । শুধু ম্যাচ ব্যাট টা নিয়েই চলে আসছি। এখন কি করি?? লজ্জায় ভাইয়া কে কিছু বলতেও পারছি না। আর এই দিকে বুকে ড্রামের বারি মারা শুরু হয়ে গেছে। ভাইয়া কে বলতেই এক রাম ঝাড়ি খাইলাম। আমাকে নাকি আবার ওপেনিং নামা লাগবে, এটা শুনে কলিজার পানি শুকায় গেল।এখন কি করি?? মরে গেলেও অন্যের গার্ড পরব না। অনেক চিন্তা ভাবনা করে আন্ডির উপর দিয়ে ভাইয়ার গার্ড টা প্লেস করে একটা গামছা দিয়ে আচ্ছাসে কাছা বেধে নিলাম <img src= /:) । বেধে তো নিসি এখন তো আর হাটতেই পারি না, দৌড়াব কেমনে?? অনেক কষ্টে দুনিয়ার সাহস এক জোট করে ফেস করতে নামলাম। সারাক্ষন ভয়ে ছিলাম, এই বুঝি চিপা দিয়ে গার্ড পরে গেল।এমন যদি হয় মান-ইজ্জত পুরা ফালুদা হয়ে যাবে। এটা চিন্তা করে এতদিনের প্র্যাক্টিসে শিখা ক্রিকেটের অর্থডক্স টেকনিক গুলো বেমালুম ভুলে গেলাম। মুরালির মত বল না দেখেই ব্যাট চালানো শুরু করলাম…ক্রিজে ২ ওভার টিকেছিলাম। :(
খেলা শেষ হইল। বোলারদের নৈপুন্যে সেদিন ম্যাচ ও জিতেছিলাম। ৪০০টাকা ও পাইলাম। আসলে পাইসিলাম ৫০০ টাকা, ১০০টাকা ভাইয়া কমিশন রেখে দিসে। বুঝেন অবস্থা… X((
পরদিন গেলাম যথারীতি প্র্যাক্টিসে। নেট এ যাব, পায়ে প্যাড পরছি এমন সময় শুনি কোচের হুংকার…

খ্যাপ মারস কে কে?? 

আমার হার্ট বিট বেড়ে গেল। কাল যে আমি খ্যাপ খেলে আসছি এটা কোচ জানল কিভাবে?? নিশ্চিত কেউ চুকলি কাটসে কোচের কাছে। স্বীকার করলাম…শাস্তি হিসেবে আমার নেটে নামা নিষিদ্ধ করা হল, সাথে উপরি হিসেবে প্রতিদিন ৫রাউন্ড এক্সট্রা দৌড়। বিমর্ষ হয়ে গেলাম। হিরো হবার সব স্বপ্ন চূর্ন-বিচূর্ণ হয়ে গেল। আমার নাম হয়ে গেল খ্যাপ মারা দুখী। সিনিয়র তো সিনিয়র, জুনিয়র রা পর্যন্ত আড়ালে আমাকে পচাইত। প্রতিদিন প্র্যাক্টিস করতে যেতাম, কিন্তু ব্যাট ধরার সুযোগ মিলত না। এটা যে কি পরিমান মানসিক কষ্ট দিত সেটা বুঝাতে পারব না। ভাবলাম সব শেষ… :(
পরদিন নির্মানের প্রথম ম্যাচ। ১৫জনের টিমে আমাকে রাখা হল দেখে একটু আশাবাদী হয়ে উঠলাম।যাক খেলতেও পারি। কোচ হয়ত মাফ করে দিসে। কিন্তু তখন কি আর জানতাম আমাকে নিয়ে তামাশা করা হবে?? ম্যাচ শুরু হবার আগে জানতে পারলাম আমি দ্বাদশ খেলোয়ার। লোটা-কম্বল আর পানির বোতল নিয়ে মাঠে মাঠে দৌড়াব শুধু। এদিকে আব্বাজান কে দাওয়াত দিয়ে রাখসি। নির্ঘাত উনি আসবেন খেলা দেখতে। এখন আমার এই মুখ কই লুকাব? মাঠে নেমেই মনে হল সবাই আমার দিকে তাকিয়ে আছে। সবাই আমাকে টিজ করছে…খ্যাপ মারা দুখী…খ্যাপ মারা দুখী…খ্যাপ মারা দুখী। লজ্জা আর লজ্জা… :(( :(( /:) X(
আমার কচি হৃদয় এটা সহ্য করতে পারল না। সব ছেড়ে-ছুড়ে দিলাম। কোচিং-নির্মান-একাডেমির খেতা পুড়ি। কোন ভদ্র মানুষ এগুলা খেলে?? সব অশিক্ষিতের দল…(আংগুর ফল টক) /:) /:)
কিন্তু যাকে একবার ভালোবেসে ফেলেছি তাকে ছেড়ে যাই কিভাবে?? পারলাম না ছাড়তে। শুরু করলাম খ্যাপ মারা। আজকে এইদিকে খ্যাপ তো কালকে ঐদিকে খ্যাপ। ধীরে ধীরে আমার রেট ও বেড়ে গেল। ৫০০থেকে আমার ক্যারিয়ার শুরু হয়েছিল। শেষ খ্যাপ টা মেরেছি গত মাসে মেরেছি ৫০০০টাকায়।এখন আর ব্যস্ততার জন্য তেমন খেলা হয়ে উঠে না। তবুও ফাঁক পেলেই খেলি। এটা ছিল আমার প্রতিশোধ। নিজের উপর প্রতিশোধ…

আজকে সবার মত আমিও মন খুলে আশ্রাফুল কে গালি দেই। ভাবি ওর জায়গায় আমি থাকলে দেখায় দিতাম…আমি কি জিনিস। কিন্তু বাস্তবতা হল আমার সেই ক্যালিবার নেই, সেই ধৈর্য নেই, সেই সহ্য শক্তি ও নেই, যা একজন ক্রিকেটার হতে গেলে লাগে… :-&

তার চেয়ে এই ভালো আছি…খ্যাপ মারা দুখী…একজন ফ্রি লেন্স ক্রিকেটার। B-)) B-))

[উৎসর্গ করলাম ক্রিকেট পাগল সকল ব্লগারকে যারা একসময় ক্রিকেটার হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন ]

 


পাহাড়ে উঠার ম্যানুয়াল

[ডিসক্লেইমার: পাহাড়ে উঠার ম্যানুয়াল ব্যাক্তিভেদে বিভিন্ন রকম হতে পারে। একেকজনের স্টাইল একেক রকম। নিচের লিখাটা সম্পূর্ন আমার জন্য প্রযোজ্য। আমার একজন প্রিয় লেখক পাওলো কোয়েলহোর বল্গে পাহাড়ে উঠার ম্যানুয়াল টা পড়ে অনুপ্রানিত হয়ে নিজের সামান্য অভিজ্ঞতা থেকে এটা লিখলাম। আমি এমন কিছু ¤¤¤¤ করে ফেলি নাই। মাত্র নেমেছি আমি, পথ তো অসীম। প্রতিনিয়ত শিখছি , এই ম্যানুয়াল ও দিন দিন পাল্টাচ্ছে, ভবিষ্যতেও পাল্টাবে। এতকিছু একটা কারনেই লিখা- কালকে বেঁচে থাকব কিনা জানি না। পরে যদি আফসোস থেকে যায়?]

 

১ পাহাড়ে উঠার কারন টা জানা জরুরী- 

 

আমার ভালো লাগে তাই এমনি এমনি পাহাড়ে উঠি। এমন কিছু বললে একদম ম্যান্দা মারা হয়ে যায়…

তাই একটু কাব্য করেই বলি, আমি রাগী, আমি হিংসুক অহংকারী। অপরদিকে

দানবীয় পাহাড় দাম্ভিকতার গম্ভীর্য গায়ে মেখে আমার দিগন্ত আটকে রাখে।

সে দম্ভ করে বলে-

দেখ আকাশ আমায় চুম্বন করে

আর দিগন্ত আমার দাস,

মেঘ ও করে কুর্নিশ

আমি দূর্ভেদ্য অবতার।

 

….আমি স্বপ্ন দেখেছি আকাশ ছোঁয়ার, মেঘ খাওয়ার আর বির্স্তীন দিগন্তে সাঁতার কাটার।

স্বপ্নের পথে আমি অবিচল….

তাই আজ আমি প্রকৃতির আভরনে নিজেকে সাজানোর চেষ্টা করে যাচ্ছি।

এক দুর্ধ্ষ গুপ্তচরের মতই পাহাড়ের সাঁচে নিজেকে গড়ার চেষ্টা করছি।

তার নিয়মেই তাকে আমি হারাব। তার দানবীয় অহমকে পরাস্ত করব।

 

এক পাহাড় থেকে আরেক পাহাড়ে উঠব, আমি আকাশ ছোঁব

, মেঘের জলে গোসল করব।

কিন্তু দিগন্তে আমার আবাস গড়া আর হবে না…

হাজার পাহাড় পরাস্ত করে দিগন্তে পৌছালেই আর একটি দিগন্তের হাতছানি….

আমার আর দিগন্তের মাঝে বাধা হয়ে আসতেই থাকবে দৃঢ়কায় পাহাড় আর আমি উঠতেই থাকব….

 

এটা আমার পাহাড়ে উঠার কারন। তাই নিজেকে বারবার মনে করিয়ে দেই পাহাড়ে উঠার আগে তাই পাহাড়ে উঠার কারন টা জানার চেষ্টা কর।

হুদাই পিক আপ করে পাবলিক হিরো হবার জন্য কষ্ট কর না। এতে হিট পাবা মাগার গিফট পাবা না চান্দু। পাহাড় সবাইকে সারপ্রাইজ গিফট দেয় না….হুহ !

 

২ প্ল্যানিং পর্ব অনেক ভাইটাল -

একটা নিয়ার টু পারফেক্ট প্ল্যানের উপর নিভর্র করে এই স্বপ্নের বাস্তবায়ন।

তাই প্ল্যানিং এ যথেষ্ঠ সময় দাও। সবদিক বিবেচনা করে রাখো। সব সময় ব্যাক আপ প্ল্যান রেখে কাজ কর।

বিস্তারিত প্ল্যানিং এ আর গেলাম না। (আমার প্ল্যানিং সিক্রেটস শেয়ার করতে অনাগ্রহী ) :P

 

৩ টীমের সদস্য: যতজন না হলেই নয় -

সদস্যদের পারস্পরিক বোঝাপোড়া কমার হার টীমের সদস্য সংখ্যার সমানুপাতিক।

মানে হল- যত জন তত মত।

আর যত মত তত কনফিউশন। কনফিউশন মানেই পাহাড়ে উঠার দফারফা।

আসল কথা হল আমি খুব হিংসুটে তাই আকাশের চুম্বন যত কম মানুষের সাথে ভাগাভাগি করা যায় আর কি….

 

৪ অন্যের দেখানো পথে চলা টা জরুরী নহে-

সব যদি আগে থেকে জেনেই যাও তো লাভ টা হল কি?

অচেনা রাস্তা, অজানা আবহাওয়া, আচানক বিপদ সম্পর্কে আগেই জেনে যাবার পর মজার আর বাকি কি থাকে।

নিজে নিজে কিছু করার চ্যালেঞ্জ নাও। পায়ের ছাপ লোকেট করে চিনতে শিখ, তারপর ফলো কর। এতে আত্মিক ক্ষুদার নিবারন ঘটবে অন্যথায় নয়।

একা একা নিজে নিজে ট্রাই করলে প্রথমবারই তুমি সফল নাও হতে পার। কিন্তু যখন পারবে তখন সেই অনুভুতিটির কোন তুলনা হবে না।

 

৫ প্রকৃতির অংশ হয়ে যাও-

যতটা পার প্রকৃতির অংশ হয়ে যাও। সামনে পানি আসলে মাছ হয়ে যাও,

বিশাল পাথর আসলে টিকটিকি, বনের পাল্লায় পরলে বানর, বুনো জন্তু আক্রমন করলে দুর্ধষ শিকারী আর বরফ এলে ইয়েতি।

মানুষ এলে হতে হবে নম্র।  প্রকৃতির নিয়ম কানুন জানতে ও মানতে হবে। নিয়ম ভেঙ্গে তোমার স্বপ্নকে ধূলিস্মাত কর না।

 

৬ নাই মামা-কানা মামা পুরান কনসেপ্ট; ভালো মামা বিনে পাহাড় উঠা নিষেধ-

 

আনকমফর্টেবল টীমে জয়েন করা আর নিজের পায়ে কুড়াল মারা একি কথা। এতে সবার আনন্দ মাটি হয়ে যায়। পথ চলার অনন্দ না থাকলে পথের আর কোন মূল্য থাকে না।

 

 ৭ চামের উপর চুম্বন নাও, চাপা বাইড়ানোর দরকার নাই-

 

এক্ষেত্রে পাওলোর সাথে একমত হতে পারলাম না। আমার অভিজ্ঞতা খারাপ। একবার শেয়ার করে খুব ভয়াবহ রকমের ফলাফল পেয়েছি।

এই ব্যাপারে অনেকের অনেক কিছু বলার থাকতে পারে, কিন্তু তাল গাছ আমার।

এই বিষয়ে একটা কোট করার লোভ সামলাতে পারছি না-

 

পথ পথিকের কাছে যায় না, পথিকই পথের খোঁজ করে নেয়। 

যে প্রকৃতই যেতে চায় সে তথ্যের অপেক্ষায় থাকে না। যার যাবার সে এমনি যাবে আমার ইনফোর অপেক্ষায় থাকবে না। কোন পথিক যথি পথে নামে তবে আমি  অবশ্যি তাকে পথ দেখিয়ে দিব। কিন্তু পথের হদিস দিয়ে রেখে পথিকের সুনামির দায় নিতে রাজী নই আমি।

 

৮ পথ টাই মূল কথা-

আকাশ চুম্বন, স্বপ্ন পূরন- সবই ঠিক আছে। কিন্তু মনে রেখ মজা টা কিন্তু পথ চলার মাঝেই নিহিত। তাই পথে মনোযোগ দাও। চোখ মেলে দেখ চারপাশে কি আছে। প্রকৃতিকে অনুভব কর। উপভোগ কর তার বিশালতাকে…..

 

৯ অপ্রত্যাশিত ঘটনা ঘটবেই-

তুমি যতই পারফেক্ট প্ল্যান বানাও ঘটনা ঘটার কোন মা বাপ নাই। সব সময় ধরে রাখো, তুমি ঠিক যা চাচ্ছো না, তখন ঠিক তাই ঘটবে। সেই অনাকাঙ্খিত পরিস্থিতির সাথে তুমি কিভাবে খাপ খাইয়ে চলতে পার তার উপর নির্ভর করে তোমার স্বপ্নের অস্তিত্ব।

 

১০কঠোরতা সাফল্যের চাবাকাঠি-

পাহাড়ে উঠা কোন ছেলেখেলা নয়। এই পথে আরাম, শান্তি আর স্বস্তির প্রত্যাশা করা নিজের দক্ষতার সাথে প্রতারনা করা। আরামের মরিচিকায় আটকে পরে পাহাড়কে ভুলে যেও না।

 

[আমি কখনো আবেগ তাড়িত হয়ে কিছু লিখি না। কিন্তু আমার এই পোস্ট টি ব্যাতিক্রম। আমি এক ধরনের জিদ থেকে এই অপরিপক্ব কাঁঠাল টা পয়দা করেছি। সেদিন ফেইসবুকে দেখি আমার মোটামটি সব কয়টা ফ্রেন্ড পাওলোর নীচের ব্লগটা শেয়ার করেছে। পাহাড়ের প্রতি আমার টানের কথা জেনে অনেকেই আমাকে সেই লিঙ্কে ট্যাগ করে দিয়েছে। অস্থির-পিনিক-উরাধুরা-ক্লাইম্বিং মাউন্টেনিয়ারিং এর বাইবেল...।ব ব্লা ব্লা ব্লা সব কমেন্ট। পাওলোর এই ব্লগ টা পড়ে আমার কেন জানি মেজাজ খারাপ হয়ে গেছিলো। ম্যানুয়াল বানানোর ও কে? এটা কি নিয়মসিদ্ধ কোন ব্যপার যে আমাকে এই সংবিধান মেনেই চলতে হবে? আমার মতে নিয়মসিদ্ধ মতবাদ আর মাউন্টেনিয়ারিং পরস্পরবিরোধী দুটো জিনিস। পাহাড়কে তুমি কোন নিয়মে বেধেঁ রাখতে পার না। পাহাড় এক এক জনের কাছে এক এক রকম। একেক জনের উপ্লব্ধি এখানে বিভিন্ন। তাই কোন একটি ম্যানুয়ালে আমি তুমি পাওলো পাহাড়কে বেধেঁ দিতে পারি না। আমি বিরক্ত ছিলাম আমার বন্ধুদের প্রতি, ওরা একটা লেখা পড়ল (বেশীর ভাগই পড়ে না-শুধু শেয়ার করে দেয়। পাওলোর ব্লগ শেয়ার করা এখনকার পপুলার ট্রেন্ড), সেটা নিয়ে কি একটু চিন্তাও করবে না? সে এই ব্যপার গুলো কিভাবে চিন্তা করছে? কখনো কি নিজেকে এই প্রশ্ন গুলো করে দেখেছি? পাওলো একজন বিখ্যাত লোক বলেই কি ও যা বলবে, যা লিখবে তা নিয়ম হয়ে যাবে? কি হাস্যকর। আর সত্যি বলতে পাওলোর এই ব্লগ টাই আমার ভালো লাগে নাই। তার সাথে আমি একমত হতে পারি নাই, এজন্যই হয়ত। কিন্তু তবুও কি একটা যেন বাদ পরে গিয়েছিল। তার ব্লগ পড়তে পড়তেই আমার জিদ উঠে যায়। ম্যানুয়াল আবার কি জিনিস? এইসব হাবিজাবি প্রশ্নের কাব্যিক উত্তর? হাহ !!! হাস্যকর। আমি অবশ্যই তার ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ-অনুভুতি কে সম্মান জানাই। পাওলোর কাছে এটা তার ব্যাক্তিগত ম্যানুয়াল হতেই পারে। কিন্তু এটাই সবার জন্য নিয়ম হয়ে যেতে পারে না।

এই বল্গ পোস্ট টি সারকাস্টিক দিক দিয়ে লিখা-চূড়ান্ত রকমের আবেগ তাড়িত লেখা। সারকাজাম টা সবাই ধরতে পারে নাই। কেউ আমাকে বিরাট বড় কেউ ভেবে বসে আছে, কেউ বা আমাকে গালি দিয়েছে, আমার অপরিপক্ব চিন্তা ও লেখা পড়ে অনেকেই মুচকি হেসেছেন- কিন্তু কেউ এই পোস্ট লিখার কারন টা ধরতে পারেন নাই। আমি ব্যর্থ। আমি বুঝাতে চেষ্পাটা করেছি ম্যানুয়াল-ট্যানুয়াল বলে আসলে কিছু নাই। এটা ব্যাক্তিগত ব্যাপার। পাওলো তার টা লিখতে পারলে আমিও পারব। আর তোমরা ও তোমাদের টা নিয়ে চিন্তা করতে পার, লিখতে পারো- জানাতে পারো। কিন্তু কোন কিছুকে অন্ধের মত ফলো কর না, এটা ঠিক না- কিছু মেনে নেয়ার আগে সেটা নিয়ে চিন্তা কর]

আপডেটঃ আজকে বড়দিন, ক্রিসমাস, হযরত ঈসা (আঃ) এর জন্মদিন। ফেসবুকে সবাই সবাইকে উইশ করছে। অবাক হয়ে গেলাম এই উইশ করা নিয়েও বিরুদ্ধ মতবাদ দেখে। কোন এক মুমিন(!!) এর ভাষ্যমতে শুধুমাত্র এই উইশ করা না করার মাঝেই নাকি আমার ঈমান নির্ভর করছে। জাকির নায়েক নাকি এটা বলেছেন। জাকির নায়েক এটা বলতেই পারেন। এটা তার নিজস্ব মতামত। এটাকে তুমি অন্ধের মত ফলো কেন করছো? তোমাকে কি আল্লাহ বিবেক দেয় নাই? চিন্তা শক্তি দেয় নাই? কে কি বল্লো কিছু না জেনে না বুঝেই ফাল পারছো কেন? এর কোন উত্তর নাই। চিন্তা করে দেখলাম মানুষ এমন ই। পাওলো বলি বা জাকির বলি- সবাই আবেগ দ্বারা তাড়িত- নিজে নিজে কিছু চিন্তা করতেও তো কষ্ট হয়। খ্যাত (বিখ্যাত/কুখ্যাত) ব্যাক্তি রা চিন্তা করুক। আমরা কিছু একটা মেনে নিব নে…

প্যাশন এমন একটা জিনিস যেটার কোন কার্য-কারন নাই, কোন মাপকাঠি নাই- একে কোন নিয়ম বা ম্যানুয়ালে শৃঙ্খলে আবদ্ধ করে রাখতে চাওয়াটাই বোকামী।

পরিশেষে, পাহাড়কে ভালবাসো। পাহাড় ও তোমাকে ভালবাসবে। 

 

অনুপ্রানিতঃ 1 minute reading: Manual for climbing mountains [Paulo Coelho's Blog]

 


খাপছাড়া কথা [দুই]

বিদায়…. ।

কতই না সহজে লিখে ফেললাম কথাটা। কিন্তু মনের এইসব গোপন খাপছাড়া কথার সাথে বাস্তবতার মিল কল্পনা করাটা ও বোকামী। স্কুলে যখন সুকান্তের লেখা পড়ে সকল শোষকের গলা কেটে রক্তে স্নান করার স্বপ্ন দেখতাম, এই সবই ছিল বয়সের দোষ। মানুষ এমনই এক রোমান্টিক হিরোর চরিত্রে নিজেকে কল্পনা করতে ভালবাসে, ভেবে শিহরিত হয়। রক্ত ফুটে টগবগ করে উঠে। প্রতিদিনের শত লাঞ্ছনা, বিবাদ, ক্ষোভ, হতাশার জাল ছিড়ে বেড়িয়ে পড়তে চায়। কিন্তু বিছানায় পাশ ফিরতেই তার তন্দ্রা ছুটে যায়। মনে পড়ে যায় কিছু দায়িত্ব, কিছু চেনা মুখ। যাদের জন্য বেঁচে থাকা, যাদের ঠোঁটের কোনায় এক চিলতে হাসির জন্য এই বেঁচে থাকা। একজনের কমেন্ট পড়লে ব্যাপার টা বুঝা যাবে-

অনিন্দিতা : আহা ! এই তো বয়স এইসব ভাবার ! না, আমিও এমন ই ভাবতাম। তার মানে এই না যে এই রকম জীবন ই আমার চাই, তবে কথা হল, কারো কারো জন্য ভালো একটা চাকুরী পাওয়াটা আবশ্যক, ইচ্ছার ব্যাপার নয়। যদি তোমাকে তোমার বাবা মা’র দায়িত্ত নিতে হয়, ভাই বোন, সংসার এর দায়বদ্ধতা থাকে।

‘দায়বদ্ধতা’- শব্দটার মত এর ব্যাপকতাও বেশ কঠিন। একজন সৌভাগ্যবান পৃথিবীতে আসে একটা পরিবারের মধ্যে। তৈরী হয় মায়ের সাথে নাড়ীর টান, বাবার সাথে আদরের। আমি ভূমিষ্ট হওয়ার আগেই সবাই যার যার মত করে আমাকে নিয়ে তাদের স্বপ্ন সাজিয়ে ফেলেছিলেন। যেই স্বপ্নে আমার চরিত্র ছিল, কিন্তু কোন ভূমিকা ছিল না। আমরা সবাই মোটামুটি এমন স্বপ্নের একটি পাত্র হয়েই জীবন যুদ্ধ শুরু করি। একজন ইন্ডিভিজুয়াল হয়ে আমরা খুব কম মানুষ-ই জন্মাতে পারি। আমরা জন্ম নেই কারো ছেলে বা মেয়ে হয়ে। প্রথমে কোন সমস্যাই হয় না। আস্তে আস্তে আমরা তাদের মত করেই জীবন যাপন করতে থাকি। কিন্তু সমস্যা তৈরী হয় যখন আমরা শিক্ষিত হই, যখন আমাদের জ্ঞান-বিবেক-বুদ্ধি জাগ্রত হয়। নিজের মত ভাবতে শিখি। মনের কোনে সুপ্তভাবে জন্ম নিতে থাকে নিজের কিছু কামনা-বাসনা-ইচ্ছা-স্বপ্ন।
বেশীর ভাগ ক্ষেত্রেই আমাদের স্বপ্নগুলো অঙ্কুরেই বিনষ্ট করে ফেলা হয়। অনেক সময় আমরা নিজেরাই নষ্ট করে ফেলি, ভাবি খামখা ঝামেলা বাড়িয়ে কি লাভ। যেমন চলছে চলুক। অনেকের ক্ষেত্রেই অন্য কোন পথ খোলা থাকে না। বুড়ো মা-বাবার অবলম্বন হয়ে তাদের থাকতে হয়। আস্তে আস্তে কখন যে মানুষ এই চক্রব্রূহতে আটকে পরে…। খুব কম সংখ্যক মানুষই আমাদের এই আর্থ-সামাজিক অবস্থায় নিজের মত করে জীবন যাপন করতে পারে। যারা পারে তারা ভাগ্যবান। আর যারা পারেন না, তারা কিন্তু মোটেও অসুখী নয়-তারা বঞ্চিত। কেননা মানুষের একটা বড় গুন হল মানিয়ে নেয়া। সব পরিস্থিতিতেই সে মানিয়ে নিতে পারে। এটা ও মেনে নেয়। কারন টা আর কিছুই না, সেই নাড়ীর টান, ভালোবাসা, পরিবার, সমাজ, দায়িত্ব।
মাঝে মাঝে হয়ত বা কোন এক নির্জন মূহুর্তে এক দীর্ঘশ্বাসে তাদের সেই স্বপ্ন গুলোকে লালন করেন।
সবার জীবন এক রকম হয় না। এমন খাপছাড়া চিন্তা অনেকেই করে। যে কয়জন আমার লেখেটি পড়েছেন তাদের মধ্যে বেশীর ভাগই আমার মত চিন্তা করেন বা এক সময় করতেন। যারা করতেন (হয়ত মনের গহীন কোন প্রকোষ্ঠে এখন তার কিছুটা সুপ্ত আছে) তারা হয়ত কোন এক পরিস্থিতির চাপে নিজের ইচ্ছাকে বিসর্জন দিয়েছেন। প্রথম দিকে খারাপ লাগলেও এক সময় নিজের মনকে মানিয়ে নিয়েছেন। এমন এক নিশ্চিত জীবনে নিজেকে সুখী করতে পেরেছেন।
তবুও মাঝে মাঝে সেই দীর্ঘশ্বাস…।
আমি যেভাবে চিন্তা করছি ব্যাপার টা কি আসলেই ততটা সহজ? বাবা-মা’র ইচ্ছা/স্বপ্ন/অধিকার কে কি এতটা সহজে বাইপাস করা যায়? যায় না, মোটেও যায় না। [ইচ্ছা করেই স্কুল জীবনে আমার মা/আমার বাবা টাইপ ভারী ভারী কথা গুলো লিখলাম না]।  এইসব প্রাকৃতিক সম্পর্ক নিয়ে কিছু ডিফাইন করার নাই।
…যতই বলি না কেন আমি রুথলেস, এইসব প্রেম-ভালবাসা, স্নেহ, আদর-আজাইড়া ইমোশন গুলো আমার মধ্যে নাই। কে কি ভাবল আমার কিছু যায় আসে না। একা আসছি এই পৃথিবীতে। একাই চলে যাব, দোজখে গেলে কেউ আমার সাথে যাবে না। আমার কৃতকর্মের জন্য যদি আমি নিজেই দায়ী থাকি তাহলে জীবন টার সাথে আমি কি করব সেটাও আমারই ঠিক করা উচিৎ। যতই বড় বড় বুলি কপচাই, যতই অংবং করি- দিন শেষে কিন্তু আমি ও মানুষ। তারপরেও কিছু কথা থাকে…
… আচ্ছা, যারা বাবা-না’র অমতে বাসা থেকে পালিয়ে বিয়ে করে তাদের সেই সময়ে মানসিক অবস্থা কেমন থাকে? তখন কি বাবা-মা’র কথা মনে থাকে? মনে থাকে এইসব দায়-দায়িত্ব, মান-সম্মান? তখন সেই সব মা-বাবাদেরই বা কেমন লাগে? নিজেদের বঞ্চিত মনে করেন কি?
বিয়ের পরে যখন আলাদা ফ্ল্যাটে উঠে যাই (সাংসারিক ঝামেলা এড়াতে) তখন তাদের কেমন লাগে? এই উওর গুলো জানা লাগবে…
পরিস্থিতির সাথে আমিও হয়ত নিজেকে মানিয়ে নেয়ার চেষ্টা করতে পারি । দায়বদ্ধতা তো আমারো কিছু আছে। কিন্তু তবুও কথা থেকে যায়, কেন? এই মানিয়ে নেয়া টা্কে কি হেরে যাওয়া বলে না? নিজের কাছে হেরে যাওয়া? যুদ্ধ না করে সত্যাগ্রহ কি কখনোই সম্মানজনক হতে পারে?
এইসব থেকেই ধীরে ধীরে জন্ম নেয় বিদ্রোহ। নিজের সাথে নিজের বিদ্রোহ। এইটুকু খাপছাড়া কথাবার্তা যেদিন উপলব্ধি করতে পারলাম সেদিন হঠাৎ করেই অনেক একা হয়ে গেলাম। চেনা সেই বন্ধুদের থেকে ধীরে ধীরে দূরে চলে গেলাম। নিজের ভাবনায় হারিয়ে যেতাম। তাদের সাথে আর কিছুতেই নিজেকে মিলাতে পারতাম না। আমার চিন্তা গুলো জট পাকানো ছিল। আমি জানতাম এমন নিশ্চিত জীবন আমি চাই না। কিন্তু এটা জানতাম না আমি তাহলে কেমন জীবন চাই। অস্থির কিছু সময় পার করলাম কিছুদিন। কিছু শেয়ার ও করতে পারতাম না বন্ধুদের সাথে। কিবা শেয়ার করব? নিজেই তো কিছু জানি না। কি করব, কেন করব, কিভাবে করব??? সবাই ভুল বুঝা শুরু করল। নিজেকে এক খোলসে আবদ্ধ করে রাখছিলাম। স্বপ্নের খোঁজে হাতড়ে বেড়াচ্ছিলাম এদিক-ওদিক।

 


About

Many will call me an adventurer- and that I am... only one of a different sort, one of those, who risks his ...